টেংরাটিলায় দুর্ঘটনার ২১ বছর পর নতুন কূপ খননের সিদ্ধান্ত
রাজনীতি
প্রকাশঃ ৯ জুলাই, ২০২৬ ১:৩৪ অপরাহ্ন
গ্যাস কূপ খনন করতে গিয়ে দুই দফা ব্লোআউট বা বিস্ফোরণের শিকার ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের টেংরাটিলায় দুই দশক পর আবারও গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্স এই অনুসন্ধান করবে বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে অনুসন্ধান, কূপ খনন ও অফশোর কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি দলের সদস্য সেলিনা সুলতানার (সংরক্ষিত মহিলা আসন-৩৫) এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে এ পর্যন্ত ৩০টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হলেও বর্তমানে উৎপাদন চলছে ২০টি গ্যাসক্ষেত্র থেকে।
মন্ত্রী আরও বলেন, নতুন সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্র শনাক্তে ব্যাপক ভূকম্পীয় (সিসমিক) জরিপ পরিচালিত হচ্ছে। ব্লক-৭ ও ৯-এ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক (২ডি) সিসমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, যার তথ্য বিশ্লেষণের কাজ চলছে বর্তমানে। হবিগঞ্জ, বাখরাবাদ ও মেঘনা গ্যাসক্ষেত্রসংলগ্ন প্রায় ১ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় শিগগিরই ত্রিমাত্রিক (৩ডি) সিসমিক জরিপ শুরু হবে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া ভোলার চরফ্যাশন, ছাতক-দোয়ারাবাজার, জামালপুর, তিতাস, হবিগঞ্জ ও নরসিংদী গ্যাসক্ষেত্রসংলগ্ন এলাকা এবং লামিগাঁও, লালাবাজার, গোয়াইনঘাট, দক্ষিণ কৈলাশটিলা ও পশ্চিম ফেঞ্চুগঞ্জ এলাকার সম্ভাব্য কাঠামোতেও একই ধরনের জরিপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সাল থেকে ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে নাইকোর সঙ্গে বাপেক্সের দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা নিষ্পত্তি হওয়ার পর টেংরাটিলায় নতুন করে গ্যাস অনুসন্ধানের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, টেংরাটিলায় প্রাথমিকভাবে দুটি কূপ খননের পরিকল্পনা হয়েছে এবং বাপেক্স ডিপিপি বা প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ শুরু করেছে।
২০০৫ সালে দুর্ঘটনার পর নানা জটিলতায় গত ২১ বছরে ছাতক ও টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে কোনো অনুসন্ধান বা উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন নিয়ে আগামী বছরই টেংরাটিলায় নতুন কূপ খনন শুরু করতে চায় বাপেক্স।
টেংরাটিলা দুর্ঘটনার জন্য নাইকো রিসোর্সেসকে দায়ী করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত ইকসিড ৪২ মিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা বাংলাদেশকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দেয়। কানাডার তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস টেংরাটিলায় গ্যাস কূপ খনন করতে গেলে ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। ব্লোআউটের কারণে আনুমানিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়।
নীতিনির্ধারক ও ভূতত্ত্ববিদরা মনে করেন, টেংরাটিলায় দশটি স্তরে গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা ছিল। পুড়ে ক্ষতির পরও এখনো কয়েকটি স্তরে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম বলেন, বিস্ফোরণ হওয়ার ফলে এটারতো (টেংরাটিলা) আর ডেভলপমেন্ট করা হয় নাই। কিন্তু এটার একটা ভালো মজুত আছে বলেই আমরা ধারণা করি। সুতরাং এখানে কূপ খননের পরিকল্পনাটা বাস্তবধর্মী এবং এটা করা উচিত।
টেংরাটিলা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে আবিষ্কৃত দ্বিতীয় গ্যাসক্ষেত্র ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের অংশ। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম দুটি জোনের মধ্যে টেংরাটিলার অবস্থান ছাতক পশ্চিম জোনে। ২০০৩ সালে বাপেক্সের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার কোম্পানি গঠন করে টেংরাটিলা ক্ষেত্রটি নাইকোর কাছে ইজারা দেওয়া হয়। যদিও ছাতক গ্যাসক্ষেত্রটি সিলেট গ্যাসফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) আওতাধীন।
সিলেট গ্যাস ফিল্ড টেংরাটিলায় গ্যাস কূপ খননে প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে পেট্রোবাংলা বাপেক্সকে দিয়ে খনন কাজ করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হক বলেন, বাপেক্স কূপ খনন করে সিলেট গ্যাস ফিল্ডের সঙ্গে মুনাফা ভাগাভাগি করবে। আমরা একটা কমিটি করেছি, এই দুই কোম্পানির মধ্যে প্রফিট শেয়ারিং কীভাবে হবে তারা প্রপোজ করবে। ওই কমিটি যেভাবে প্রস্তাব দেবে, সেটা আমরা মন্ত্রণালয়কে প্রপোজ করব।
টেংরাটিলায় প্রথমে পূর্বাংশে গ্যাস কূপ খনন করতে চায় বাপেক্স, এরপর পশ্চিম জোনে। যেহেতু দুর্ঘটনায় গ্যাসক্ষেত্রটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাই দুর্ঘটনাস্থল থেকে দূরে ভিন্ন স্থানে ত্রিমাত্রিক জরিপের মাধ্যমে স্থান নির্ধারণ করে কূপ খনন করতে চায় সংস্থাটি।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডের কর্মকর্তারা জানান, ছাতকের পূর্ব ও পশ্চিম দুটি জোনের মধ্যে টেংরাটিলা পশ্চিম জোনে অবস্থিত। পশ্চিম জোন থেকে একটি কূপে অতীতে গ্যাস উত্তোলন হয়েছে, যেখান থেকে মোট ২৭ বিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করে ছাতক সিমেন্ট কারখানায় সরবরাহ করা হয়। ১৯৮৪ সালে ছাতক গ্যাসফিল্ড বন্ধ হয়ে যায়। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের পূর্ব জোনে এখনো কোনো অনুসন্ধান হয়নি।
পশ্চিম জোনে টেংরাটিলায় দশটি স্তরে গ্যাসের সম্ভাবনা ও মজুত থাকার বিষয় জরিপে উঠে এসেছে। এখানে অন্তত চারশ বিসিএফ গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনার কথা জানা যায়। এসজিএফএলের মহাব্যবস্থাপক জীবন শান্তি সরকার বলেন, তাদের হিসাবে পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে দুই থেকে তিন টিসিএফ গ্যাস রিসোর্স আছে বলে ধারণা রয়েছে।
তবে ভূতত্ত্ববিদ ড. বদরুল ইমাম বলেন, উত্তোলনযোগ্য মজুত হতে হলে কূপ খননের পর আবিষ্কারের মাধ্যমেই নিশ্চিত হতে হবে। রিসোর্স বলতে বোঝায় যে পুরো অবস্থানটায় গ্যাসটা আছে। কিন্তু আমরা রিজার্ভ বলি যেইটাকে উঠিয়ে নিয়ে আসতে পারব সেইটাকে। তো রিজার্ভ যদি বলা হয়, সেটা দুই টিসিএফ রিসোর্স হতে পারে, তবে উত্তোলনযোগ্য ষাট শতাংশ হতে পারে, খুব ভালো হলে সত্তর শতাংশ হতে পারে। আমি মনে করি না এখানে দুই টিসিএফ গ্যাস আছে। এখানে (পূর্ব-পশ্চিম মিলিয়ে) নেয়ার-এবাউট এক টিসিএফ থাকতে পারে বলে আমার ধারণা।
টেংরাটিলায় বিস্ফোরণের পর প্রচুর সম্পদ পুড়ে নষ্ট হয়েছে বলে সেখানে প্রকৃতপক্ষে কতটা মজুত অবশিষ্ট আছে, তা এখনো একটি প্রশ্ন। ভূকম্পন জরিপ এবং কূপ খননের মাধ্যমেই টেংরাটিলার মজুত পরিস্থিতি সম্পর্কে চূড়ান্ত ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
পেট্রোবাংলার সবশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৩০ টিসিএফ গ্যাসের প্রমাণিত মজুত পাওয়া গেছে, যার মধ্যে প্রায় ২৩ টিসিএফ ইতিমধ্যে উত্তোলন হয়েছে এবং বর্তমানে অবশিষ্ট আছে প্রায় সাত টিসিএফ। পেট্রোবাংলার প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিদেশি কোম্পানি ও আমদানিনির্ভরতাই এখন মোট সরবরাহের চার ভাগের তিন ভাগ। বিদ্যমান হারে উত্তোলন অব্যাহত থাকলে বর্তমান প্রমাণিত মজুত দশ বছরের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তবে নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে প্রমাণিত মজুত বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন ভূতত্ত্ববিদরা।
বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্র সুরমা ভূগঠনে অবস্থিত, যার গভীরতা আড়াই হাজার মিটারের মধ্যে। তবে সুরমা ভূগঠনের নিচে থাকা বরাইল স্তরে গ্যাস উৎপন্ন ও জমে থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদরা। ড. বদরুল ইমাম বলেন, বরাইল আছে তার উপরে সুরমা, তার উপরে তিপাম এই ধরনের নামকরণ করে শিলাস্তরগুলোকে ভাগ করা হয়। আমাদের দেশে যেসব গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে, এগুলো বেশিরভাগ সুরমা বেসিনে। তিপাম হচ্ছে উপরের লেয়ার, এই স্তরে কোনো গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া যায়নি। সুরমার মধ্যেই সব গ্যাসক্ষেত্র আছে। কিন্তু তার নিচে যে বরাইল স্তর, তার মধ্যে গ্যাসের সম্ভাবনা অনেক বেশি। কারণ গ্যাসগুলো উৎপন্ন হয়েছে এই বরাইল স্তরের ভেতরে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ একটি বদ্বীপ এলাকা। এটার সঙ্গে যদি আমরা তুলনা করি, নাইজেরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস গালফ কোস্টের সঙ্গে তুলনা করা যায়। প্রাকৃতিকভাবে এগুলো গ্যাস রিচ। বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি ঠিক একই রকম।
বদরুল ইমাম আরও বলেন, বরাইল গ্রুপ বা ফরমেশনে ড্রিলিং করলে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বেসিক্যালি লেস এক্সপ্লোরড। কম অনুসন্ধান হয়েছে এমন একটা জায়গা। আমরা যে পরিমাণ গ্যাস উত্তোলন করছি বা আবিষ্কার করেছি, সেটা একটা অংশ মাত্র। এখানে যদি যথেষ্ট পরিমাণ অনুসন্ধান করা যায়, নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হবে।
সুনামগঞ্জ, টেংরাটিলা, ছাতক, গ্যাসফিল্ড, উত্তোলন