দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর: সেই ভয়াল ১৭ আগস্ট আজ
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩৯ অপরাহ্ন
আজ ১৭ আগস্ট। ২০০৫ সালের এই দিনে দেশের ৬৩ জেলার প্রায় সাড়ে ৪০০ জায়গায় একযোগে চালানো হয়েছিল সিরিজ বোমা হামলা। লক্ষ্যবস্তু ছিল আদালত, বিমানবন্দর, মার্কিন দূতাবাস থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় পর্যন্ত। নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালিয়েছিল। ২১ বছর পূর্তিতে আজ দেশজুড়ে স্মরণ করা হচ্ছে সেই ভয়াল দিনটিকে।
মুন্সীগঞ্জ ছাড়া দেশের সব জেলায় সেদিনের এই হামলায় দুইজন নিহত ও অন্তত ১০৪ জন আহত হন।
পুলিশ সদর দপ্তর ও র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সারাদেশে ১৫৯টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশে (ডিএমপি) ১৮টি, চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) ৮টি, রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) ৪টি, খুলনা মহানগর পুলিশে (কেএমপি) ৩টি, বরিশাল মহানগর পুলিশে (বিএমপি) ১২টি, সিলেট মহানগর পুলিশে (এসএমপি) ১০টি মামলা হয়। এ ছাড়া ঢাকা রেঞ্জে ২৩টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১১টি, রাজশাহী রেঞ্জে ৭টি, খুলনা রেঞ্জে ২৩টি, বরিশাল রেঞ্জে ৭টি, সিলেট রেঞ্জে ১৬টি, রংপুর রেঞ্জে ৮টি, ময়মনসিংহ রেঞ্জে ৬টি এবং রেলওয়ে রেঞ্জে ৩টি মামলা দায়ের হয়।
এসব মামলার মধ্যে ১৪২টিতে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। বাকি ১৭টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করা না যাওয়ায় চূড়ান্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়। এসব মামলায় মোট ৯৬১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ১ হাজার ৭২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
পুলিশ জানায়, ১৫৯টি মামলার মধ্যে এ পর্যন্ত ৯৪টি মামলার বিচার সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে ৩৩৪ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। বাকি ৫৫টি মামলা এখনো বিচারাধীন, যার আসামি সংখ্যা ৩৮৬ জন।
নিষ্পত্তি হওয়া মামলাগুলোয় ৩৪৯ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ২৭ জনকে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়, যার মধ্যে ৮ জনের ফাঁসি ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে। এসব মামলায় ৩৫৮ জন খালাস পেয়েছেন এবং ১৩৩ জন আসামি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। ঢাকায় বিচারাধীন আরও ৫টি মামলা সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
ঝালকাঠি জেলার দুই বিচারককে হত্যার দায়ে ২০০৭ সালের ৩০ মার্চ ছয় জঙ্গি নেতার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাঁরা হলেন—জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান, তাঁর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই, সামরিক কমান্ডার আতাউর রহমান সানি, চিন্তাবিদ আব্দুল আউয়াল, খালেদ সাইফুল্লাহ এবং সালাউদ্দিন।
২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের পর কয়েক মাসের মধ্যে আরও একাধিক ধারাবাহিক বোমা হামলায় বিচারক ও আইনজীবীসহ মোট ৩০ জন নিহত এবং চার শতাধিক মানুষ আহত হন।
ওই বছরের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের আদালতে জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এতে তিনজন নিহত এবং বিচারকসহ অন্তত ৫০ জন আহত হন। এর কিছুদিন পর সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীর ওপর বোমা হামলা চালানো হয়, যাতে তিনি ও তাঁর গাড়িচালক আহত হন।
১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারক বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায় আত্মঘাতী জঙ্গিরা। এতে নিহত হন ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাড়ে এবং সোহেল আহম্মদ। এ হামলায় আহত হন আরও অনেকে।
সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ওই বছরের ২৯ নভেম্বর গাজীপুর বার সমিতির লাইব্রেরি এবং চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে। গাজীপুর বার লাইব্রেরিতে আইনজীবীর পোশাকে প্রবেশ করে এক আত্মঘাতী জঙ্গি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এ হামলায় আইনজীবীসহ ১০ জন নিহত হন; আত্মঘাতী হামলাকারীও নিহত হয়। একই দিন চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে জেএমবির আত্মঘাতী জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটায়, যাতে পুলিশ কনস্টেবল রাজিব বড়ুয়া ও একজন সাধারণ মানুষ নিহত হন। এতে পুলিশসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ আহত হন।
একই বছরের ১ ডিসেম্বর গাজীপুর ডিসি অফিসের গেটে আবারও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে নিহত হন গাজীপুরের কৃষি কর্মকর্তা আবুল কাশেম। এ ঘটনায় কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন। ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। শহরের বড় পুকুরপাড়ে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর কার্যালয়ের সামনে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে স্থানীয় উদীচীর দুই নেতাসহ ৮ জন নিহত হন এবং শতাধিক মানুষ আহত হন।
সিরিজ বোমা হামলা, জেএমবি, ২০০৫, জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ, ১৭ আগস্ট