জলাবদ্ধতায় কালো হওয়া ধান বিক্রি করতে না পেরে বিপাকে কৃষকরা
কৃষি
প্রকাশঃ ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১:৪২ অপরাহ্ন
হাওরাঞ্চলের জেলা সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় বোরো ধান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ফলানো ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বিক্রি করতে পারছেন না তাঁরা। জলাবদ্ধতার পানির নিচ থেকে কষ্ট করে তোলা ধান শুকানোর পর কালচে রং ধারণ করায় তা কিনতে রাজি হচ্ছেন না ব্যবসায়ী বা খাদ্য গুদাম কেউই। আবার জলাবদ্ধতা শুরুর আগে যেসব ধান কৃষকরা তুলতে পেরেছিলেন, সেগুলোরও দাম মিলছে না প্রত্যাশামতো।
বছরজুড়ে সংসারের নানা প্রয়োজন সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, বিয়ে-শাদি, ঘরবাড়ি মেরামত, এমনকি পরের মৌসুমের চাষাবাদের পুঁজি সবকিছুই এই বোরো ধান বিক্রি করা টাকা থেকে মেটান জগন্নাথপুরের কৃষকরা। কিন্তু এবার অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার পাকা ফসল তলিয়ে গেছে। কিছু কৃষক নৌকা নিয়ে পানির নিচে ডুব দিয়ে কষ্টেসৃষ্টে কিছু ধান উদ্ধার করলেও তা শুকানোর পর কালো হয়ে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতা মিলছে না।
কৃষকদের ভাষ্য, জগন্নাথপুরের অর্থনীতি অনেকটাই বোরো ফসলনির্ভর। এবার ফসল কাটার মৌসুমের শুরুতেই টানা বৃষ্টিতে হাওরে পানি জমে যাওয়ায় বেশিরভাগ কৃষক ফসল তুলতেই পারেননি। বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষকদের একটি অংশ প্রাণান্ত চেষ্টায় কিছু ধান রক্ষা করলেও বাজারে কিংবা সরকারি গুদাম কোথাও তা বেচতে পারছেন না। এর মধ্যে যোগ হয়েছে নতুন সংকট ৯ আগস্ট থেকে হঠাৎই সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ধান কেনা সম্ভব হয়নি।
এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকার তালিকা তৈরি করে তিন মাসের আর্থিক সহায়তা ও চাল বরাদ্দের কর্মসূচি নিলেও জগন্নাথপুরে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের একটি বড় অংশ এই সহায়তা থেকে বাদ পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষত পৌরসভা ও আশপাশের কয়েকটি ইউনিয়নে এই তালিকা নিয়ে ক্ষোভ দানা বেঁধেছে, আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা পড়েছে একাধিক লিখিত অভিযোগ।
মেঘারকান্দি গ্রামের কৃষক দ্বিজেশ দাস এবার বোরো মৌসুমে তুলতে পেরেছেন ১৫০ মণ ধান। তাঁর হিসাবে, আবাদ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতি মণে খরচ পড়েছে অন্তত ৮০০ টাকা। অথচ ধান কেনার মতো ক্রেতাই মিলছে না বলে জানান তিনি। তিনি জানান, বিশেষ অনুরোধ করে বিক্রি করতে চাইলে ভালো ধান ৭০০ টাকা মণ ও জলাবদ্ধতা থেকে উত্তোলন করা একটু কালো রঙের ধান সাড়ে চারশ টাকা মণ দাম করে। সরকারি খাদ্য গুদামে বিক্রি করা আমাদের জন্য তো স্বপ্ন। কোনো দিন বিক্রি করতে পারি নাই, নানা অজুহাতে ফিরতে হয়।
আগামী মৌসুমে বোরো আবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।
দাসনোওয়াগাঁও গ্রামের কৃষক সারদা চরণ দাস বলেন, জলাবদ্ধতায় ফসল হারিয়ে দিশেহারা অবস্থায় পড়েছেন এলাকার কৃষকরা। সরকারি সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার তিন মাসের জন্য নগদ অর্থ ও চাল দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে, এটা যথার্থ নয়। আগামী বোরো মৌসুমের ফসল উত্তোলনের আগ পর্যন্ত এই সহায়তা চালিয়ে যাওয়া দরকার।
তিনি জানান, এবার এক হাল জমিতে বোরো আবাদ করেও এক ছটাক ধান তুলতে পারেননি তিনি, ফলে আগামী মৌসুমে কীভাবে আবাদ করবেন—তা নিয়ে দিশাহারা অবস্থায় আছেন।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব আমিনুল হক সিপন বলেন, প্রকৃতির প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে ফসল ফলানোর পরও যদি কৃষক ন্যায্য দাম না পান, তাহলে ধীরে ধীরে চাষাবাদে আগ্রহ হারাবেন কৃষকরা, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্বার্থে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্যমতে, এবার ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল, যেখানে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ১ লাখ ২৮ হাজার ৫০৯ মেট্রিক টন। বাস্তবে উত্তোলন হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন। প্রাথমিকভাবে আট হাজার কৃষককে ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত সহায়তা পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার ৬০৩ জন।
এ বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ বলেন, কৃষকরা নানা সংকটে থাকলেও আমরা তাদেরকে নানা ধরনের সরকারি প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করছি। বোরো মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও আউশে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ক্ষতি পোষানো হবে।
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য কর্মকর্তা (এলএসডি) শিবু ভূষণ পাল জানান, চলতি মৌসুমে ১৯৮২ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল। গত ৩ মে থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সংগ্রহ কার্যক্রম চলার কথা থাকলেও ৯ আগস্ট থেকেই হঠাৎ তা বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত মোট ১ হাজার ১১৪ মেট্রিক টন ধান কেনা সম্ভব হয়েছিল।
ধানের ন্যায্যমূল্য, বোরো ধান, জলবদ্ধতা, কৃষি সংকট, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ