অবৈধপথে গ্রিস যাত্রা
ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু, নিখোঁজ সুনামগঞ্জের ৫ যুবক
অভিবাসন
প্রকাশঃ ১৬ আগস্ট, ২০২৬ ৮:৫০ অপরাহ্ন
লিবিয়া থেকে সাগর পথে অবৈধপথে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানি সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নিহতদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ৩ আগস্ট রাতে ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা গ্রিসের উদ্দেশে লিবিয়ার তাবারুক উপকূল থেকে যাত্রা শুরু করে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে।
ইঞ্জিনচালিত নৌকা থেকে বেঁচে যাওয়া একজনের বাড়ি সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া গ্রামে। বেঁচে যাওয়া ওই যুবকের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই নৌকায় থাকা শান্তিগঞ্জ উপজেলার অন্তত ৫জন যুবকের এখনো কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।
তারা হলেন, পাগলা শত্রুমর্দনের হৃদয় পাল, চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন এবং রনসী গ্রামের মো. তালহা।
হৃদয় পালের চাচা কানন পাল জানান, ‘তার সাথে সর্বশেষ কথা হয়েছিলো গত ৩১ জুলাই। সেদিন জানিয়েছিলো যে ৩ তারিখ গেমে যাবে। সেদিন ২টি নৌকা রওনা দিয়েছিলো। ১ নম্বর নৌকা থেকে যোগাযোগ করে জানানো হয়েছিলে যে আমার ভাতিজা ২ নম্বর নৌকায় আছে। পরে আর কোন খোঁজ আসেনি। জেনেছি নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ১০ দিন ধরে তারা ভাসছিলো।’
তিনি বলেন, ‘এখন মিশরে অনেককে জীবিত এবং মৃত হিসেবে উদ্ধার করা হলেও হৃদয়ের কোন খোঁজ আমরা পাচ্ছি না। সে এখনো নিখোঁজ।’
বাকি আরো দুইটি পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তারা মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রভাবশালী দালাল সেসব পরিবারকে আশ্বস্ত করেছে তাদের ছেলেরা বেঁচে আছে। তাদেরকে ঠিকঠাক পেতে হলে কোন কথা বলা যাবে না।
রোববার (১৬ আগস্ট) লিবিয়া থেকে সাগর পথে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে ১১ বাংলাদেশির মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা মিশরের পুলিশ ও গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন খাবার ও পানির সংকটে তাদের চোখের সামনেই কয়েকজনের মৃত্যু হয়। মরদেহগুলোতে পচন ধরে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় সেগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হন তারা।
যাত্রা শুরুর কিছুক্ষণ পরই ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকায় থাকা খাবার ও পানির মজুত সাগরে ভেসে যায়। এরপর খাবার ও পানি ছাড়াই নৌকাটি নিয়ে বিপজ্জনক যাত্রা অব্যাহত রাখেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর হঠাৎ নৌকার ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে নৌকাটি সাগরে ভাসতে থাকে।
এভাবে টানা নয় দিন ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর বাতাসের স্রোতে নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলের কাছে পৌঁছে যায়। পরে মিশরের নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৮ জনকে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসাধীন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।
এ বিষয়ে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, আহত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিষয়ে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শরিফ এবং স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের বাদরান নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে দূতাবাসের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
স্থানীয় পুলিশ দূতাবাসকে জানিয়েছে, তারা মোট ৩০ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছে। এর মধ্যে ১৮ জনের শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছে। তবে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের জাতীয়তা সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি।
দূতাবাস আরও জানায়, হাসপাতালে ভর্তি আহতদের চিকিৎসার অগ্রগতি এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আহত বাংলাদেশি নাগরিকরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিশরের সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আটক বাংলাদেশিদের ট্রাভেল পারমিটের মাধ্যমে যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
ভূমধ্যসাগর, অভিবাসনপ্রত্যাশী, সুনামগঞ্জ, শান্তিগঞ্জ, দালাল