
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। স্বৈরাচারী সরকারের পতন, নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগমন, ভিন্নমতের প্রসার, এবং গণতান্ত্রিক কাঠামো পুনর্বিন্যস্ত করার দাবি—এই সবকিছুর মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আবার আলোচনায় এসেছে– গণমাধ্যম সংস্কার। এ আলোচনায় অংশ নিচ্ছে রাষ্ট্র, পেশাদার সাংবাদিকরা, শিক্ষাবিদরা এবং সচেতন নাগরিকরা। প্রশ্ন উঠছে—গণমাধ্যম আসলে কার? কার জন্য? আর কারা এতে প্রতিনিধিত্ব পায়?
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ রাজধানী ঢাকা-কেন্দ্রিক। রাজধানীর বাইরে থাকা ঘটনাগুলো কেবল তখনই জাতীয় গুরুত্ব পায়, যখন তা কোনো ‘সংবেদনশীলতা’ সৃষ্টি করে। যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বড়সড় দুর্ঘটনা বা রাজনৈতিক সংঘাতের মতো ঘটনা। কিন্তু প্রতিদিন যে ছোট ছোট সংকট, দুর্ভোগ, উদ্ভাবন কিংবা সাফল্যের গল্প সৃষ্টি হয় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, সেগুলোর প্রতি কেন্দ্রের আগ্রহ থাকে না। এই কেন্দ্রীভবন কেবল ভূগোলের প্রশ্ন নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির সংকট। সংবাদকে কেন্দ্রের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা দেশের বিশাল সংখ্যক মানুষকে গণমাধ্যম কাঠামোর বাইরে ঠেলে দিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সাংবাদিকতা—বিশেষ করে ‘হাইপারলোকাল সাংবাদিকতা’—শুধু বিকল্প নয়, বরং অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। হাইপারলোকাল সাংবাদিকতা মানে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের ছোট ছোট সমস্যাকে গুরুত্ব দেয়া, একটি এলাকার মানুষের কথা তুলে ধরা, এমনকি একটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এটি এমন এক ধারা, যেখানে বড় পটভূমির সঙ্গে ছোট ঘটনাগুলোর সংযোগ খোঁজা হয়। একজন কৃষকের জল সংকট, একটি স্কুলের নারী শিক্ষকের আবাসন, একটি গ্রামীণ বাজারের পরিবেশগত দূষণ কিংবা একজন প্রবাসীর পাঠানো রেমিটেন্স কীভাবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে—এসবই হাইপারলোকাল সাংবাদিকতার আওতায় পড়ে।
বাংলাদেশের প্রচলিত গণমাধ্যম কাঠামোতে এই গভীরতা প্রায় অনুপস্থিত। জাতীয় দৈনিকগুলোতে সিলেটের বা দেশের অন্য প্রান্তের সংবাদ স্থান পায় অনেকটা ‘সংরক্ষিত কোটা’র মতো। ফলে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় মানুষের গণমাধ্যমের প্রতি আস্থা কমে গেছে। তারা গণমাধ্যমকে নিজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখে না। এতে শুধু গণমাধ্যমই দুর্বল হয়নি, দুর্বল হয়েছে গণতান্ত্রিক চর্চাও। কারণ তথ্য ছাড়া মত গঠিত হয় না, মত ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়—আর সিদ্ধান্ত ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি কাগুজে ধারণা।
এই প্রেক্ষাপটে সিলেটের একসময়ের পাঠকনন্দিত ও জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘সিলেট ভয়েস’ হাইপারলোকাল নিউজ পোর্টাল হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। এটি সময়ের দাবি। এটি কেবল একটি ওয়েবসাইটের রি-ডিজাইন নয়, বরং একটি আদর্শিক অবস্থান।
নতুন আঙ্গিকের সিলেট ভয়েস-এ আমাদের লক্ষ্য হলো— সিলেট বিভাগের প্রতিটি শহর, ইউনিয়ন এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষ যেন তাদের কথা, সমস্যা ও সম্ভাবনা গণমাধ্যমে দেখতে পায়। আবার এই খবরকে পৌঁছাতে হবে দেশের কেন্দ্রে, আওয়াজ উঠাতে হবে নীতিনির্ধারকদের সেই টেবিলে, যেখানে প্রান্তিক জনপদের দাবি বেশিরভাগ সময়ই ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে থাকে।
আমরা মনে করি, গণমাধ্যমের দায়িত্ব ‘খবর পরিবেশন’ নয়, বরং সমাজের প্রতিচ্ছবি বা আয়না হয়ে দাঁড়ানো। হাইপারলোকাল সাংবাদিকতা শুধু আয়না হিসেবে দাড়ায় না, বরং প্রতিবিম্বের গায়ে জমে থাকা ধুলোমাটি সরিয়ে দেয়। এটি বলে, সমাজ কেবল রাজধানীর বড় বড় বিলবোর্ড নয়—একটি ভাঙা ব্রিজ, একটি নদীঘেঁষা গ্রাম, একটি অনাবাদী জমিও সমাজের মুখচ্ছবি।
এই নতুন কাঠামোয় আমরা প্রতিদিনের সাধারণ ঘটনাকে ঠিক ততখানি গুরুত্ব দিবো, যতখানি গুরুত্ব দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী বড় ঘটনাগুলো পায়। স্থানীয় রাজনীতির পেছনের মেরুকরণ, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার বাস্তবতা, গ্রামের পাঠাগারে তরুণদের উদ্যোগ, কিংবা একটি প্রাচীন মসজিদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঐতিহ্য—সবই স্থান পাবে সিলেট ভয়েস-এ। কারণ মানুষের জীবনে যেটা গুরুত্বপূর্ণ, সাংবাদিকতার কাছে সেটাই জরুরি।
তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারে আমরা কনটেন্টকে আরও মানবিক, অংশগ্রহণমূলক এবং ভিজ্যুয়াল-নির্ভর করে তুলতে চাই। তরুণ রিপোর্টারদের মাধ্যমে মাঠভিত্তিক অনুসন্ধান, সাধারণ মানুষের ভিডিও সাক্ষাৎকার, ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক উপস্থাপন—এসবই সিলেট ভয়েসের ভবিষ্যতের দিকরেখা। আমরা মনে করি, পাঠক এখন শুধু পাঠক নয়—সে তথ্যদাতা, সংশোধনকারী এবং প্রশ্নকারী হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
এই পথ সহজ নয়। প্রচলিত কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে হাইপারলোকাল সাংবাদিকতার চর্চা গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদী কাজ। কিন্তু আজকের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট, সেখানে এই উদ্যোগ কেবল সাহসিকতা নয়, এটি সময়ের দাবি।
সিলেট ভয়েস এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে। আমরা বিশ্বাস করি, গণমাধ্যম সংস্কার যদি বাস্তবায়ন করতে হয়, তাহলে কেন্দ্র নয়, প্রান্ত হতে হবে আলোচনার শুরু। কারণ গণতন্ত্রের সুর তখনই স্পষ্ট হয়, যখন সেটি প্রান্তিক গ্রামের শেষ সীমানা থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে।
সামনে আরও অনেক কাজ। ভুলও হবে, সমালোচনা আসবে—তবু আমরা থামছি না। কারণ হাইপারলোকাল সাংবাদিকতা শুধু একটি রিপোর্টিং পদ্ধতি নয়, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে মানুষই প্রধান।
শেয়ার করুনঃ
সম্পাদকীয় থেকে আরো পড়ুন
সিলেট ভয়েস, হাইপারলোকাল সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয়


