অভিবাসন নয়, মৃত্যুযাত্রা: সিলেটের করুণ বাস্তবতায় দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন
সম্পাদকীয়
প্রকাশঃ ৩০ মার্চ, ২০২৬ ১:৪০ অপরাহ্ন
ওরা ৩৮ জন বাংলাদেশি যুবক। ইউরোপের রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়ে ঘর ছেড়েছিলেন লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগরের উত্তাল পথ ধরে গ্রিসের উদ্দেশ্যে। জানতেন এই পথ সহজ নয়, মৃত্যুও হতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর ভয় থেকেও উন্নত জীবনের আশা তাদেরকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো।
কিন্তু এই স্বপ্ন পুরণ হয়নি অন্তত ২২ জনের। দালালের প্ররোচণায় ঘর ছেড়ে লিবিয়ার ‘গেমঘরে’ দীর্ঘদিন অভুক্ত-অর্ধভুক্ত অবস্থায় থাকার পর যখন তাদেরকে একটি ছোট নৌকায় তুলে দেয়া হয়, তখন সাথে দেয়া হয়নি কোন খাবার এবং পানি। ছয়দিন এভাবেই ভাসতে ভাসতে যখন একের পর এক যুবকের মৃত্যু হতে থাকে, তাদের মরদেহ ভাসিয়ে দেয়া হয় ভূমধ্যসাগরে।
গ্রিসের কোস্টগার্ড এই নৌকায় থাকা ২১ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তাদের বেশিরভাগই অভুক্ত অবস্থায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থাগুলো জানাচ্ছে। অন্যদিকে মৃতদের মধ্যে যে ১১ জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, তারা সবাই সুনামগঞ্জের।
দীর্ঘদিন ধরেই অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইউরোপ প্রবেশের এই প্রবণতা সিলেটের তরুণদের মধ্যে রয়েছে। আগে লিবিয়া হয়ে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা হতো, এখন সে পথ অনেক বেশি কঠিন হয়ে যাওয়ায় পাচারকারিরা বেছে নিয়েছেন লিবিয়া থেকে গ্রিসের পথ।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) এর তথ্যমতে, ২০১৪ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪,৪৬৭ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী ভূমধ্যসাগরে মৃত্যুবরণ করেছেন কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন, যার বড় একটি অংশ বাংলাদেশী তরুণদের।
২০১৯ সালে মে মাসে লিবিয়া থেকে ইতালির পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ৬৫জন অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যু হয়, যার মধ্যে ৪০ জন ছিলেন বাংলাদেশি। এই নিহতের বড় একটি অংশ সিলেটের হওয়ায় সে সময় ঘটনাটি আলোড়ন তোলে। এর পিছনের দালালচক্রকে ধরতে পুলিশ-প্রশাসনের অনেক আইনী উদ্যোগ চোখে পড়ে, সচেতনতায়ও নেয়া হয় নানা উদ্যোগ।
কিন্তু করোনাপরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার, বা পরবর্তিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তেমন কঠোর কোন উদ্যোগ না থাকায় একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেই প্রচলিত পন্থায় তারা তরুণ-যুবকদের আকৃষ্ট করছে। ইতালি নয়, বরং বড় নৌকায় নিরাপদে গ্রিসে যাওয়ার লোভ দেখাচ্ছে।
ভূমধ্যসাগরে নিহত সাজিদুর রহমানের বাবা আব্দুল গণির বক্তব্যেই যেন উঠে এসেছে বাস্তবতা। “দালাল মুজিবের সাথে ১২ লাখ টাকার চুক্তি ছিল, কথা ছিল বড় স্টিলের নৌকায় করে নিবে। কিন্তু উঠিয়েছিলো প্লাস্টিকের নৌকায়। এর আগে গেমঘরে বন্দী রেখে ১৭ দিন, খাবার দেয়নি। নৌকায় উঠানোর পরেও খাবার দেয়নি। ছেলেটা না খেয়ে মারা গেছে।”
এই সাজিদুর সিলেটের একটি মাদ্রাসা থেকে পড়াশোনা শেষ করে গ্রামের পার্শ্ববর্তী একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা শুরু করেছিলেন। কিন্তু কৃষক পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান সাজিদুরের উপর ভর করে ইউরোপে স্বপ্ন। যার করুণ পরিণতি তিনি ভোগ করেছেন।
যদি নাগরিক সচেতনতা না বাড়ে, তাহলে এক্ষেত্রে কী করণীয় কোন কিছুই নেই? অবশ্যই এখানে সরকারের করণীয় অনেক কিছুই আছে, তবে এজন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা আর সঠিক কর্মপদ্ধতি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দালালচক্রের সকল সদস্যকে আইনের আওতায় আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি গ্রামপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বড় পরিসরের ক্যাম্পেইন প্রয়োজন।
যখন ভূমধ্যসাগরের এই ঘটনায় সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জেরই অন্তত ১২ জন যুবকের মৃত্যু হয়েছে, তখন সরকারের প্রবাসী কল্যান ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী এবং শ্রম মন্ত্রী কিন্তু এই সিলেট অঞ্চলেরই জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ আরিফুল হক চৌধুরী।
এ অবস্থায় সিলেট বিভাগের প্রতিটি অঞ্চলকে কেন্দ্র করে দালালচক্রের যে দৌরাত্ম তরুণ-যুবকদের আকৃষ্ট করে মৃত্যুর মুখে নিয়ে যাচ্ছে, তার বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতর পদক্ষেপ সরকার, বিশেষ করে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কাছ থেকে প্রত্যাশা করছি।
সিলেট, অভিবাসন, সম্পাদকীয়, ভূমধ্যসাগর,