অভিবাসন নয়, মৃত্যুযাত্রা: সিলেটের করুণ বাস্তবতায় দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন
সম্পাদকীয়
প্রকাশঃ ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন
অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন করার মাধ্যমে বাংলাদেশের এক অনিশ্চিত সময়ের সফল পরিসমাপ্তি ঘটেছে। এই নির্বাচন শুধু সরকার পরিবর্তনের ঘটনা নয়, বরং একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংকটের আনুষ্ঠানিক নিষ্পত্তি ঘটালো।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের ভোটে নতুন সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হলো। এখন সময় কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় গণতান্ত্রিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিলো, তার গণতান্ত্রিক চরিত্র বারবার বাধাগ্রস্ত হলেও জনতার আন্দোলনই প্রতিবার পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করেছে। যথাযথ গণতান্ত্রিক ধারার পুনরুত্থান শুরু হয়েছিলো ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তারপর ২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে যে অগণতান্ত্রিক এবং কর্তৃত্ববাদী সরকারব্যবস্থার সূচনা হয়েছিলো, তা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি করে এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট গভীর করে।
৯০-এর গণআন্দোলনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান আওয়ামী কর্তৃত্ববাদের পতন ঘটায়। এই অভ্যুত্থানের তাৎপর্য কেবল সরকার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠনের সামাজিক দাবি হিসেবে দেখা দেয়। শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে দেশ শুধু একটি শাসনব্যবস্থা থেকে মুক্ত হয়নি, বরং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল।
ড. মুহাম্মদ ইউনুস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। এ সরকারের প্রাথমিক পদক্ষেপে সংস্কারের ইচ্ছা স্পষ্ট থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ধীরগতি ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের ঘাটতি চোখে পড়ে। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবের মধ্য থেকে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলো কার্যকর না হওয়া একটি বাস্তব ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত থাকবে।
একই সঙ্গে সংস্কার ইস্যুতে বিস্তৃত রাজনৈতিক ঐক্যমত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারা রাষ্ট্র পরিচালনার জটিল বাস্তবতাকেই সামনে আনে। তবে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়ার উদ্যোগ গণতান্ত্রিক বৈধতা পুনর্নির্মাণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে বিবেচিত হবে।
এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতা একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজন। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর জনআস্থা পুনরুদ্ধার করা যেকোনো গণতান্ত্রিক উত্তরণের মূল শর্ত, এবং এই দিক থেকে সরকার তার প্রধান দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়েছে। এই সফলতা প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র চাইলে সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে।
বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে দুই দশক পরে সরকার গঠনের পথে। এই রায়কে কেবল দলীয় বিজয় হিসেবে নয়, বরং ভোটারের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে দেখা জরুরি।
নতুন সরকারের দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমানকে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ভেঙে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য পুনর্গঠন করতে হবে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশের নেতৃত্বে প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও গণতন্ত্র টিকে থাকে কেবল শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে, আর এটি নিশ্চিত করাই হবে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নবনির্বাচিত বিএনপি এবং অংশগ্রহণকারী সকল দল অবশ্যই অভিনন্দনের দাবি রাখেন। তবে গণতন্ত্রের এ অগ্রযাত্রার মুহূর্তে আনুষ্ঠানিক অভিনন্দনের চেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি সতর্কতা, যাতে নতুন সরকার কর্তৃত্ববাদের পুনরাবৃত্তি না করে আইনের শাসন, নির্বাচনী সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার মতো মৌলিক প্রশ্নগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়।
সকল রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত দায়িত্ব হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সংঘাতে নয়, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখা। আর এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারলেই বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উদাহরণ হয়ে উঠবে, যখন ক্ষমতার পালাবদল নয়, নিয়মতান্ত্রিক শাসনই হবে স্থায়ী বাস্তবতা।