৩১ মে ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / পরিবেশ

প্লাস্টিক দূষণে বিপর্যস্ত কালনী, হুমকিতে মানুষ ও জীববৈচিত্র্য

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ৩১ মে, ২০২৬ ৯:১৩ অপরাহ্ন


‘স্কুল মাদরাসাদি শিক্ষাদীক্ষার আছে বিধি/মধ্যে বহে কালনী নদী তাতে কালো জল/কালনী নদীর উত্তর পাড়ে, আছি এক কুঁড়েঘরে/ পোস্ট অফিস হয় ধলবাজারে, ইউনিয়ন তাড়ল।’ বিখ্যাত বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের কালজয়ী আত্মজীবনীমূলক গানের অংশ এটি। তাঁর রচিত ‘কালনীর ঢেউ’ ও ‘কালনীর কূলে’ দুটি বিখ্যাত বইয়ের নামও এই নদীর নামে। এছাড়াও কালনী নদীর স্রোতধারা তাঁর অনেক গানে অমর হয়ে আছে। 

 

কালনী নদী নিয়ে ভাটির মানুষের আবেগ আর সংস্কৃতির মিশেল একাকার হয়ে আছে। আজ সেই কালনী নেই তার আগের রূপে। ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে প্লাস্টিক বর্জ্যের ভাগাড়ে। নদীর পানিতে ভাসছে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, খাবারের মোড়ক ও নানা ধরনের বর্জ্য। 

 

নদীর তীরজুড়েও জমে আছে প্লাস্টিকের স্তূপ। এ দূষণ শুধু নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ নষ্ট করছে, তা নয়। বরং জলজ প্রাণী, মৎস্যসম্পদ এবং নদীনির্ভর মানুষকে স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলছে। 

 

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, কালনী নদীর পানি ব্যবহারকারী নদীপারের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত। গবেষকেরা বলছেন, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বাজার ও বসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরাসরি প্লাস্টিক ফেলা এবং নদীতীরবর্তী মানবিক কর্মকাণ্ডের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

 

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এ গবেষণা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস: প্লাস্টিকস-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটিকে বিস্তীর্ণ কালনী নদীতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক গবেষণা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 

 

বিশ্ববিদ্যালয়টি মৎস্য অনুষদ, উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মৎস্য বিভাগ, কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদ এবং জলজ সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগের ৮ শিক্ষার্থীর যৌথ গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে। 

 

গবেষণায় কালনী নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আটটি পৃথক স্টেশন থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষকেরা নদীর পানি, নদীতীর ও আশপাশের কৃষিজমি থেকে বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করেন।

 

সংগ্রহ করা প্লাস্টিকের মধ্যে ছিল পলিথিন ব্যাগ, পানীয়ের বোতল, খাবারের প্যাকেট, প্লাস্টিকের বস্তা, ওষুধ ও ব্যক্তিগত পরিচর্যা সামগ্রীর মোড়ক, ফোম, প্লাস্টিক টেবিলক্লথ এমনকি ব্যবহৃত জুতাও। পরে সেগুলোকে আলাদা করে ওজন, পরিমাণ ও ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। 

 

গবেষণায় দেখা গেছে, নদীতে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পিইটি (PET) ও এলডিপিই (LDPE) ধরনের প্লাস্টিক। এর মধ্যে পানির বোতল ও পলিথিন ব্যাগের আধিক্য সবচেয়ে বেশি। 

 

গবেষকেরা নদীটির বিভিন্ন অংশে মোট ৮টি পয়েন্ট নির্ধারণ করেছিলেন, যেগুলোকে S1 থেকে S8 নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। S1, S2 ও S5 এলাকাকে সবচেয়ে বেশি দূষণপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে S2 স্টেশনে প্রতি বর্গমিটারে সর্বোচ্চ ০ দশমিক ০৮টি ম্যাক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। S1-এ ছিল ০ দশমিক ০৭ এবং S5-এ ০ দশমিক ০৬টি।

 

গবেষণায় বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় মানুষের বসতি, বাজার, মাছ ধরার কার্যক্রম, নৌযান চলাচল ও বর্জ্য ফেলার প্রবণতা বেশি, সেসব এলাকাতেই প্লাস্টিকের ঘনত্বও বেশি। বিশেষ করে নদীর ধীরগতির অংশ ও বাঁকগুলোতে প্লাস্টিক জমে থাকছে দীর্ঘ সময়। 

 

গবেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, নদীতে জমে থাকা বড় প্লাস্টিক ধীরে ধীরে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। এসব কণা পানির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। এতে মাছ, জলজ প্রাণী এবং শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও বিষাক্ত উপাদান প্রবেশের ঝুঁকি তৈরি হয়। 

 

গবেষণায় নদীর পানির তাপমাত্রা, পিএইচ, টিডিএস, দ্রবীভূত অক্সিজেনসহ বিভিন্ন উপাদান পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা গেছে, নদীর বিভিন্ন অংশে পানির গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। S1 এলাকায় পানিতে টিডিএসের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। গবেষকদের মতে, এটি শিল্পবর্জ্য, কৃষিজ রাসায়নিক ও গৃহস্থালি বর্জ্যের প্রভাব নির্দেশ করে। অন্যদিকে S8 এলাকায় পানির তাপমাত্রা ছিল সবচেয়ে বেশি। 

 

গবেষণায় পানি দূষণ সূচক ২ দশমিক ৬১ থেকে ২ দশমিক ৯৫-এর মধ্যে পাওয়া গেছে, যা নদীটিকে ‘মধ্যম মাত্রার দূষিত’ হিসেবে নির্দেশ করে। গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক দূষণ শুধু দৃশ্যমান বর্জ্যের সমস্যা নয় এটি পানির রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যও বদলে দিচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

 

গবেষণার অংশ হিসেবে নদীতীরবর্তী ১২৬ জন বাসিন্দার ওপর সামাজিক জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা যায়, নদীর পানি ব্যবহারকারীদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন স্বাস্থ্যসমস্যায় ভুগছেন। সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে চর্মরোগ। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তাঁরা ত্বকের নানা সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া অ্যালার্জি, চুলকানি ও ত্বকের প্রদাহের ঘটনাও পাওয়া গেছে। 

 

গবেষণায় দেখা গেছে, নদীর পানি দিয়ে সবচেয়ে বেশি গোসল ও কাপড় ধোয়ার কাজ করা হয়। অনেকেই রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এমনকি দৈনন্দিন গৃহস্থালি কাজেও এ পানি ব্যবহার করেন। 

 

গবেষকদের মতে, দূষিত পানির দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের কারণে এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের সঙ্গে মিশে থাকা রাসায়নিক উপাদান মানুষের ত্বক ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

 

কালনী নদী উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর একটি। এটি সুরমা-কুশিয়ারা নদী ব্যবস্থার অংশ এবং স্থানীয় মৎস্যসম্পদ ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

 

গবেষণায় বলা হয়েছে, নদীতে জমে থাকা প্লাস্টিক জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনচক্র ব্যাহত করছে। মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর খাদ্যশৃঙ্খল নষ্ট হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য ঝুঁকিতে পড়ছে।

 

দিরাই উপজেলা সদরের বাসিন্দা মুজাহিদ সর্দার তালহা বলেন, কালনী নদী শুধু একটি জলধারা নয়। এটি এই অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনের অংশ। আমাদের শৈশব কেটেছে এই নদীর পাড়ে। এই নদীর পানিতে স্নান, মাছ ধরা, নৌকায় চলাফেরা সবই ছিল জীবনের স্বাভাবিক অংশ। শাহ আবদুল করিমসহ অনেক বাউল শিল্পীর গানে এই নদী বারবার এসেছে। কারণ এটি ছিল মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-প্রকৃতির প্রতীক।

 

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে সেই কালনী নদী ভয়াবহ দূষণের শিকার। প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন ও নানা বর্জ্যে নদীর পানি কালো ও ভারী হয়ে উঠছে। এখন নদীর পাড়ে দাঁড়ালে আগের সেই নির্মল দৃশ্য দেখা যায় না। মাছ কমে গেছে, পানির গন্ধ বদলে গেছে। নদী যেন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে।

 

হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটি-হাউস এর নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, কালনী নদী একসময় ছিল স্বচ্ছ পানির প্রবাহ, মাছের ভাণ্ডার আর স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু আজ সেই নদীই প্লাস্টিক বর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে মারাত্মক সংকটে।

 

তিনি আরও বলেন, নদীর তীরে গড়ে ওঠা হাট-বাজার ও বসতিপূর্ণ এলাকা থেকে সরাসরি প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভয়াবহ পরিবেশগত ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই দূষণ শুধু নদীর পানি নষ্ট করছে না, বরং জলজ প্রাণী, মৎস্যসম্পদ এবং নদীনির্ভর মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

 

তিনি বলেন, সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া কালনী নদীর এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে কালনী তার ঐতিহাসিক ও পরিবেশগত পরিচয় হারিয়ে ফেলবে।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

কালনী নদী, প্লাস্টিক দূষণ, বিপর্যস্ত পরিবেশ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ