সুনামগঞ্জে ধান-চালের অস্বাভাবিক দামের ব্যবধান: কৃষকরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত
কৃষি
প্রকাশঃ ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:০০ অপরাহ্ন
সুনামগঞ্জের হাওর-অঞ্চলে বোরো ধানের বাজারে এক চরম বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে। একই সময়ে ধানের দাম পড়েছে ছয় থেকে আট শত টাকা মণে, অথচ চাল বিক্রি হচ্ছে আড়াই থেকে আড়াই হাজার আটশত টাকায়। সরকার নির্ধারিত ধানের ন্যায্যমূল্য এক হাজার চার শত চল্লিশ টাকা থাকলেও কৃষকরা অর্ধেক দামে জমির ফসল বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে উৎপাদন খরচও উঠছে না অনেকের। স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করেন, ধান ক্রয় ও চাল বিক্রয়ে সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকায় এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
আগাম বন্যা ও অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এই বছর হাওরের প্রায় চল্লিশ শতাংশ জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। বাকি ফসল সংগ্রহেও গড়ে উঠেছে নানা জটিলতা। বহু কৃষক সরকারি গুদামে ধান জমা দিতে পারেননি, ফলে তারা নিজেদের ঘরে ধান রেখেছেন। কাটার পর থেকে আর্দ্রতায় ধান কালচে বর্ণ ধারণ করছে। ব্যবসায়ীরা এই সুযোগে ধানের গুণাগুণ নষ্টের দোহাই দিয়ে অর্ধেক দামে ফসল কিনে নিচ্ছেন।
কালিপুর গ্রামের কৃষক বদিউজ্জামান মাত্র ৬৫০ টাকা মণে তার সমস্ত ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রতি ত্রিশ শতাংশ জমিতে আট থেকে নয় হাজার টাকা খরচ হয়। এ থেকে দশ থেকে বারো মণ ধান ফলে। এই দামে তার খরচেরও অর্ধেক পাওয়া যায়নি।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও বড় কৃষক আব্দুস সালাম প্রায় হাজার মণ ধান পেয়েছেন, কিন্তু তা বিক্রি করতে পারছেন না। তিনি বলেন, পাইকাররা ছয় থেকে আট শত টাকার বেশি দাম দিতে রাজি নয়। আমার এলাকার শত শত কৃষক এভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
এ মৌসুমে সুনামগঞ্জে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে যথেষ্ট। সরকার ২১ হাজার ৩৪৯ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। প্রায় বিশ হাজার মেট্রিক টন সংগ্রহ করা হয়েছে। অথচ এত বেশি উৎপাদন সত্ত্বেও বাজারে চালের দাম কোনো পরিবর্তন হয়নি। চাল এখনও মণপ্রতি আড়াই হাজার ছয়শত থেকে আড়াই হাজার আটশত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ভোক্তারা এই মূল্য দিয়ে চাল কিনছেন, অথচ একই সময়ে ধানের উৎপাদক কৃষকরা সর্বনিম্ন মূল্য পাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য মোনাজ্জির হোসেন সুজন বলেন, সুনামগঞ্জের কৃষক হাওরের ধানেই নির্ভরশীল। তারা ন্যায্যমূল্য না পেলে নানা সংকটে পড়েন। বাজারে যদি কোনো সিন্ডিকেট থাকে তা ভেঙে দিয়ে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার মনে করেন, স্থানীয় পর্যায় থেকে সরাসরি কৃষকদের ধান সংগ্রহ করলেই এই অবস্থার সমাধান হবে। তিনি বলেন, কৃষকরা এখন বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমে ধান বিক্রি করছেন। পাইকাররা ধান কালচে হওয়ার অজুহাত দিয়ে কম দামে কিনছে, কিন্তু চালের দাম কমাচ্ছে না। এটি স্পষ্ট যে এখানে বাজার নিয়ন্ত্রণ চলছে।
ধানের দাম, চালের দাম, কৃষক, সিন্ডিকেট, বোরো ধান, হাওর