ফায়ার স্টেশন নেই, তবু তামাবিল বন্দর দিয়ে আমদানি হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ মিথানল
অনিয়ম-দুর্নীতি
প্রকাশঃ ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:০০ পূর্বাহ্ন
সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দরে নেই কোনো ফায়ার স্টেশন। নেই রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ল্যাব কিংবা পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জামও। অথচ এই বন্দর দিয়েই নিয়মিত আমদানি হচ্ছে অত্যন্ত দাহ্য ও বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মিথানল। এমনকি বন্দরের ভেতরে কোনো ধরনের বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে স্থানান্তর করা হচ্ছে এসব রাসায়নিক।
এ অবস্থয় যেকোনো সময় অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বন্দরটি। ব্যবসায়ীদের ধারণা, বন্দরে মিথানল থেকে কোনোভাবে আগুনের সূত্রপাত হলে মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে বন্দরের শত শত শ্রমিক, চালক ও বিভিন্ন যানবাহন মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তারা দাবি করেন, সম্প্রতি তামাবিল বন্দর দিয়ে মিথানল আমদানি আরও বাড়ার পেছনে রহস্য রয়েছে।
মিথানল বর্ণহীন, উদ্বায়ী ও অত্যন্ত দাহ্য রাসায়নিক তরল। শিল্পকারখানায় এটি দ্রাবক বা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি মানুষের জন্য মারাত্মক বিষাক্ত। বাতাসে মিথানলের বাষ্প নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশলে এবং আগুনের সংস্পর্শ পেলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও দ্রুত আগুন ধরে যেতে পারে। মিথানল ফ্যাকাশে নীল শিখায় জ্বলে, যা সাধারণ আলোতে সহজে দেখা যায় না। এর ফলে হঠাৎ চারদিকে তীব্র আগুন ছড়িয়ে পড়তে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভারত থেকে একসময় সপ্তাহে ৪-৫টি মিথানলবাহী ট্যাংকলরি তামাবিল স্থলবন্দরে প্রবেশ করতো। বর্তমানে প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ গাড়ি করে মিথানল আমদানি হচ্ছে। বন্দরের ভেতরেই কোনো ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়া ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে স্থানান্তর করা হয় এসব রাসায়নিক। পরে সিলেটের বিভিন্ন ল্যাবে পাঠানো হয় নমুনা। এরপর রিপোর্ট আসার আগ পর্যন্ত অন্তত দুইদিন বন্দরেই থাকে কন্টেইনারগুলো। এরপর এগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানা হয়।
একটি সূত্র বলছে, ভারতের আসাম রাজ্যের পার্বতপুর-ডিব্রুগড় পেট্রোকেমিক্যাল থেকে দেশে আমদানি করা হচ্ছে মিথানল। দেশের কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান তামাবিল বন্দর দিয়ে এটি আমদানি করেছে।
তামাবিল স্থলবন্দরের আমদানিকারক ফারুক আহমদ বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুব একটা ভালো নেই। আগের তুলনায় ব্যবসা-বাণিজ্য অনেকাংশে কমেছে। আগে প্রতিদিন ৭০০-৮০০ ট্রাক পাথর আমদানি হতো। এখন গড়ে ৭০০ ট্রাকের ওপরে আমদানি হয় না।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে তামাবিল বন্দর দিয়ে মিথাইল আমদানি বেড়েছে। আগে সপ্তাহে ৪-৫টি ট্যাংকলরি ভারত থেকে আসতো। এখন প্রতিদিনই ৮-১০ গাড়ি মিথানল ভারত থেকে আসছে। এসব ট্যাংকলরি থেকে ড্রামে রাখা হয় মিথানল।’
বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো বালাই নেই মন্তব্য করে আমদানিকারক বলেন, ‘একটা ফায়ার স্টেশনও নেই। রাসায়নিক থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে তা নির্বাপণ করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। এটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। প্রতিদিন এই অবস্থার মধ্যেই আমাদের শ্রমিকরা বন্দরে কাজ করছেন। এতে জানমাল দুটোই নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে।’
এর আগে ২০২৪ সালের ৯ নভেম্বর দুপুরে তামাবিল স্থলবন্দরে একটি ভারতীয় মিথানলবাহী লরির সামনের অংশে আগুন লাগে। এতে বন্দরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে তাঁদের পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় ডাউকি স্থলবন্দরের ফায়ার সার্ভিসের একটি পানিবাহী গাড়ি এসে স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
সে সময় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেসময় বন্দরে থাকা অন্য মিথানলবাহী ট্যাংকলরি, পাথর ও কয়লাবাহী শত শত ভারতীয় ট্রাক দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। আতংকে বন্দরে থাকা কয়েক হাজার শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ছোটাছুটি করে নিরাপদ স্থানে চলে যান। এরপর থেকে সবসময়ই আতংক কাজ করে।
শুধু তাই নয়, বন্দরে আমদানি করা রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কেমিক্যাল ল্যাব বা টেস্টিং মেশিন নেই। একই সঙ্গে মিথানলের মতো ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক নিরাপদে রাখার পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই বন্দরে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, যে বন্দরে একটি বিপজ্জনক রাসায়নিক পদার্থ পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ল্যাব নেই, সেখানে কীভাবে নিয়মিত মিথানলবাহী ট্যাংকলরি প্রবেশ করছে এবং খালাস হচ্ছে?
মিথানল আমদানির সঙ্গে কাগজে-কলমে সিলেটের কোনো প্রতিষ্ঠান জড়িত না থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র এই বন্দর দিয়ে মিথানল আমদানিতে সহযোগিতা করছে বলে জানা গেছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার পরও মিথানল আমদানিতে এই বন্দর ব্যবহারের পেছনে ভিন্ন কারণ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেমিক্যাল ইঞ্জনিয়ারিং ও পলিমার সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাস্তাবুর রহমান বলেন, ‘মিথানল একটি উচ্চ মাত্রার দাহ্য পদার্থ। এটি কাস্টমসের সব নিয়ম মেনেই আমদানি করা উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমাদের ল্যাবে নমুনা পরীক্ষা করা হতো। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ল্যাবে পরীক্ষা হয় না। অন্য একটি গ্রুপ এখন পরীক্ষা করে।’
বন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সাবেক পরিচালক ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, ‘মিথানল এতটা শক্তিশালী দাহ্য পদার্থ, যদি বিস্ফোরণ ঘটে তাহলে পুরো তামাবিল বন্দর পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। এত ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ আমদানি করা হচ্ছে অথচও কোনো অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নেই। এটা এক ধরনের তামাশা।’
তিনি বলেন, ‘দেশের এত বন্দর থাকতে সিলেট দিয়ে মিথানল আমদানি একেবারে স্বাভাবিক বিষয় না। এখানে কিছু একটা আছে। আমরা চাই দেশে আমদানি অব্যাহত থাকুক। কিন্তু শতভাগ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগে নিশ্চিত করতে হবে।’
বন্দর দিয়ে প্রতিদিন মিথানল আমদানি করা হচ্ছে বলে জানান তামাবিল স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘এই আমদানির সঙ্গে সিলেটের স্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠান সরাসরি যুক্ত নয়, তারা শুধু শুল্কায়ন ও খালাসের কাজে সহযোগিতা করে। মূলত ঢাকার দুটি গ্রুপ তাদের কোম্পানির মাধ্যমে এই মিথানল নিয়ে আসে।’
বন্দরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘যেহেতু এই আমদানির অনুমতি এনবিআর থেকে দেওয়া হয়, তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ হিসেবে এটি নিষেধ করার সুযোগ নেই। তবে এখানে কোনো ফায়ার সার্ভিস সিস্টেম না থাকার বিষয়টি এরইমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বন্দরে একটি নতুন প্রকল্পের কাজ চলমান। যেখানে সম্পূর্ণ ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’
বন্দরে সরাসরি কোনো রাসায়নিক পরীক্ষার সুযোগ বা ল্যাব নেই জানিয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, ‘মিথানল বন্দরে আসার পর প্রতিটি ড্রাম থেকে নমুনা সংগ্রহ করে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট দেখেই পণ্য খালাস বা রিলিজ দেওয়া হয়। পরীক্ষার রিপোর্ট আসতে ন্যূনতম দুদিন সময় লেগে যায়।’
মিথানল আমদানি, তামাবিল বন্দর, ফায়ার স্টেশন, অগ্নিনিরাপত্তা, রাসায়নিক ল্যাব, ঝুঁকিপূর্ণ আমদানি