২০ আগস্ট ২০২৬

রাজনীতি / রাজনৈতিক দল

সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ

মনোনয়নবঞ্চিতদের বিএনপির ‘মূল্যায়ন’, বিরোধীদল বলছে ‘দলীয়করণ’

মোসাইদ রাহাত

প্রকাশঃ ১৯ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৩৫ অপরাহ্ন


সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন সিলেট বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা। শেষ পর্যন্ত অনেকেরই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ‘মন খারাপ’ নিয়েও নির্বাচনে দলের মনোনীত প্রার্থদের পক্ষে কাজ করেছেন তারা। অবশেষে টানা ১৭ বছর পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। দায়িত্বগ্রহণের ছয়মাস পূর্ণও করেছে নতুন সরকার। 


এ অবস্থায় মনোনয়নবঞ্চিতদের ‘মন খারাপের’ প্রতিদান দিতে শুরু করেছে দলটি। সরকারের ছয় মাসের মাথায় সিলেটের নয়টি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে মনোনয়নবঞ্চিত নয় বিএনপি নেতাকে। 


বিএনপির পক্ষ থেকে এটিকে দলের ‘মূল্যায়ন’ বলা হচ্ছে। তবে বিরোধী দল বলছে, এর মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ করছে সরকার। এতে করে প্রশাসনে দলীয় প্রভাব আরও বাড়বে। 


চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই গত ২২ ফেব্রুয়ারি সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিলেট সিটি করপোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৩ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। তবে এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পান বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এমএ মালিক।


একই আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ও দলটির নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সম্পাদক মো. আবদুস সালামকে (এম এ সালাম) গত ২০ জুন বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। 


এর আগে গত ১৫ মার্চ সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পান বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামীম। তিনি সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। এ আসনে সিলেট জেলা বিএনপির সাদারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। 


গত ১১ জুন সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র ও সাবেক কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। তিনি কোনো আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী না হলেও সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। 


গত ৯ আগস্ট বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকীকে সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।


সর্বশেষ গত সোমবার (১৭ আগস্ট) জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক পদে নিয়োগ দেওয়া হয় সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিমকে। তিনি সিলেট-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি।


অন্যদিকে সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরীকে। তিনি সুনামগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিন্তু নির্বাচনে এই আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। 


মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয় জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান। তিনি মৌলভীবাজার-৩ আসনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন। 


এছাড়াও হবিগঞ্জ-২ মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আহমেদ আলী মুকিব আব্দুল্লাহকে হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। 


দলীয় নেতাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রদানের বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেনবে দেখছে না বিরোধীদল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট মহানগরী আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘দলীয় নেতাকর্মীদের সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, এগুলো জনগণের সম্পদ। এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। তা না হলে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হবে এবং প্রশাসনে দলীয় প্রভাব আরও বাড়বে।’


তিনি আরও বলেন, সরকার মাত্র ছয় মাস হয়েছে। এটা বেশি সময় নয়। কিন্তু ৬ মাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দলীয়করণ করেছেন। সরকার যদিও মুখে বলেন সবার আগে বাংলাদেশ কিন্তু বাস্তব সবার আগে আমি ও আমার দল।’ 

দলীয়করণের মাধ্যমে কোনো অযোগ্য ব্যক্তিদের সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্থান দিলে দুর্নীতি বাড়বে এবং দেশের মানুষের মধ্যে স্থবিরতা বিরাজ করবে বলে মনে করেন তিনি। 


তবে বিরোধীদলের এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয়, বিএনপি নেতারা। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নুরুল বলেন, ‘রাজনীতিবিদদের নিয়োগ দেওয়ার মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জনবান্ধব ও কার্যকর করে তোলা হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে যাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে, তাদের দায়িত্বশীল পদে যুক্ত করা হলে সাধারণ মানুষের সমস্যা ও প্রত্যাশাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। আমরা চাই সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের সেবার জায়গা হিসেবে আরও শক্তিশালী হোক।’


জেলা বিএনপির সভাপতি ও সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘এই প্রক্রিয়াটি দলীয়করণ হচ্ছে বলে আমি মনে করি না। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশকে সচল রাখতে যোগ্য ব্যক্তিদের সরকার স্থান দিয়েছে। যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের পরিচয় হবে কাজের মধ্য দিয়ে, দলীয় হিসেবে নয়। 


সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন বলেন, ‘গেল ১৭ বছর আমরা দেখেছি ফ্যাসিবাদের সাথে ভাগবাটোয়ারা করে কারা চলেছেন। আজ যারা ১৫-২০ বছর ধরে জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের দল মূল্যায়ন করছে। এটা কোনো দলীয়করণ নয়।’


শেয়ার করুনঃ

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন

মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, দলীয়করণ, সিলেট বিএনপি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, প্রশাসন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ