১৫ আগস্ট ২০২৬

সিলেটজুড়ে

দানবাক্সে ফেলা চিঠিতে এক নারীর আকুতি

‘আল্লাহ তুমি মাদকদ্রব্য পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দাও’

প্রকাশঃ ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১:২৫ অপরাহ্ন


সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে মানুষ টাকা-পয়সার পাশাপাশি নানা আকুতিও রেখে যান। কেউ চান নিজের বা স্বজনের মঙ্গল, কেউ লেখেন কোনো মানত বা প্রার্থনার কথা। শনিবার তৃতীয়বারের মতো প্রকাশ্যে দানবাক্সের টাকা গণনার সময় পাওয়া গেছে এমন কয়েকটি চিঠিও।


এরমধ্যে হেনা নামের এক নারীর লেখা একটি চিঠি নজর কেড়েছে। স্বামীকে ‘ভুল পথ’ থেকে ফিরিয়ে আনতে আল্লাহর কাছে আকুতি জানিয়ে চিঠিটি লিখেছেন তিনি। চিঠির বিস্তারিত বক্তব্য সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেলেও, এটি যে স্বামীর জন্য লেখা প্রার্থনা,সেটিই সেখানে স্পষ্ট।


শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে মাজারের দানবাক্স ও দানের ডেগগুলোর সিলগালা খোলার কাজ শুরু হয়। তিনটি ডেগ ও তিনটি বড় দানবাক্স খোলার পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টাকা গণনা শুরু হয়। অন্তত ৩০ জন স্বেচ্ছাসেবী প্রকাশ্যে বসে টাকা গুনছেন। তাদের পাশে প্রশাসনের প্রতিনিধি, মাজারের মুয়াল্লি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত রয়েছেন।


আজ ৩৪ দিন পর দানবাক্স খোলা হলো। এর আগে সর্বশেষ ১১ জুলাই দানবাক্স খোলা হয়েছিল। তারও আগে ২২ জুন প্রথমবার নতুন দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে টাকা গণনা করা হয়।



দীর্ঘ বিরতির পর এবার দানবাক্সে আগের দুইবারের তুলনায় বেশি টাকা পাওয়া যেতে পারে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত মোট কত টাকা পাওয়া গেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।


এদিকে মাজারের দানবাক্সে পাওয়া হেনার চিঠিটি মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, প্রত্যাশা ও সংকটের একটি ভিন্ন চিত্র সামনে এনেছে। স্বামীকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে চিঠিতে আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছেন তিনি।  শনিবার গণনার সময় চিঠিটি অন্যগুলোর মধ্যে নজর কাড়ে এই চিঠি।


চিঠিতে হেনা লিখেন-
ইয়া আল্লাহ, আমি তোমার ওলির মাজারে আমার মনের কষ্টগুলো ব্যক্ত করছি। যারা আমার স্বামীকে কুপথে নিছে আল্লাহ তুমি তাদের বিচার করিও। আমার মত কষ্ট যেন কেউ না পায়। আল্লাহ তুমি মাদকদ্রব্য পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন করে দাও। -হেনা’


মাজারে আসা মানুষজনের অনেকেই দানবাক্সে টাকা দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের মনের কথা লিখে রাখেন। সেই চিঠিগুলো কখনো ব্যক্তিগত প্রার্থনা, কখনো পরিবারের কারও জন্য দোয়া চাওয়া, আবার কখনো কোনো সংকট থেকে মুক্তির আকুতি বহন করে।


নতুন দানবাক্স স্থাপনের পর এর আগে দুই দফা প্রকাশ্যে টাকা গণনা হয়েছে। ২২ জুন প্রথমবার গণনায় পাওয়া যায় ১৭ লাখ ৫৪৯ টাকা। এর ১৮ দিন পর ১১ জুলাই দ্বিতীয়বার দানবাক্স খুলে পাওয়া যায় ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা।


দুই দফায় পাওয়া নগদ বাংলাদেশি অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬৪ লাখ ১০ হাজার ৭০২ টাকা। এর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও অন্যান্য সামগ্রীও পাওয়া যায়।


আজ তৃতীয়বারের গণনায় দানবাক্স ও ডেগে বিপুল পরিমাণ টাকা ছাড়াও কয়েকটি চিঠি পাওয়া গেছে। দীর্ঘ ৩৪ দিন পর দানবাক্স খোলায় এবার অর্থের পরিমাণ আগের দুই দফাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।



টাকা গণনার সময় সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন সাংবাদিকদের বলেন, সর্বশেষ ১১ জুলাই টাকা গণনা হয়েছিল। এরপর প্রায় এক মাসের ব্যবধান হয়েছে। এবারও সবার উপস্থিতিতে প্রকাশ্যেই টাকা গণনা করা হচ্ছে।


জেলা প্রশাসক বলেন, স্থানীয় রাজনীতিক, গণ্যমান্য ব্যক্তি, মাজারের মুয়াল্লি ও প্রশাসনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে গণনা চলছে। সাংবাদিকেরাও বিষয়টি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন। এতে টাকা গণনা নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ বা অবিশ্বাসের সুযোগ থাকবে না।


প্রসঙ্গত, মাজারের আয়-ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার জন্য গঠিত ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, কমিটি কাজ করছে এবং নিয়মিত বৈঠক হচ্ছে। কাজ শেষ হওয়ার আগে কমিটির বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে না। দ্রুত এ বিষয়ে অগ্রগতি হবে বলেও জানান তিনি।


মাজারের আয়-ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত জুনে নতুন দানবাক্স বসানো হয়। এর আগে ১২ জুন তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দেন। তার নির্দেশে ১৮ জুন মাজারের ঐতিহ্যবাহী ডেগ সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়।


এনিয়ে প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষের মধ্যে টানাপোড়েন তৈরি হলে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। পরে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবশ্য এটিকে নিয়মিত বদলি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।


পরিস্থিতি সামাল দিতে ২৬ জুন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের উদ্যোগে সিলেট সার্কিট হাউসে জরুরি বৈঠক হয়। সেখানে মাজারের পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী স্বচ্ছতা আনতে ১৩ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়।


কমিটিকে একমাসের মধ্যে মাজার পরিচালনা ও অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। তবে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত সেই পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ্যে আসেনি।


শেয়ার করুনঃ

সিলেটজুড়ে থেকে আরো পড়ুন

হযরত শাহজালাল মাজার, শাহজালাল মাজার, সিলেট মাজার, মাজারের দানবাক্স, দানবাক্সের টাকা, হেনার চিঠি, স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ