রায়নগরে ট্রিপল মার্ডার
জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরেই হত্যার অভিযোগ মেয়ের, আটক বাবুলের নাম নেই এজাহারে
অপরাধ-বিচার
প্রকাশঃ ১৫ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৫ পূর্বাহ্ন
সিলেটে বাসার ভেতরে নৃশংসভাবে স্বামী-স্ত্রী ও তাদের গৃহকর্মী খুনের ঘটনায় থানায় এজহার দাখিল করেছেন আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম দম্পতির মেয়ে সেলিনা সুলতানা। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের কোতোয়ালি থানায় এজহার দাখিল করেন তিনি।
এজহারে জমি সংক্রান্ত পূর্ব বিরোধের জেরেই তারা বাবা-মা ও গৃহকর্মীকে ভাড়াটিয়া লোক দিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। তবে, হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের হাতে আটক বাবুল মিয়ার নাম এজহারে উল্লেখ করা হয়নি।
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মো. মঈনুল জাকির এজহার দায়েরের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এজহারে সেলিনা সুলতানা উল্লেখ করেন, ১৯৯৭ সালে তিনি ও তার বাবা পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতি সিলেটের কাছ থেকে রিকাবীবাজারের সরষপুর এলাকায় আনুমানিক ১২ শতক জমি লিজ নিয়ে সেখানে বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করছিলেন।
২০০৬ সালে ইম্পালস বিল্ডার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম তাদের লিজ নেওয়া জমিসহ সমিতির ৮০ শতক জমি ইম্পালস বিল্ডার্সের নামে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিল করেন এবং নামজারি করে মালিকানা দাবি করেন।
এ নিয়ে ২০১৬ সালে সিরাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে স্বত্ব মামলা করেন তার বাবা। পরে মামলাটি স্বত্ব-২১১/২০২৩ নম্বরে রূপান্তরিত হয়ে যুগ্ম জেলা জজ অতিরিক্ত আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেলিনার দাবি, মামলা প্রত্যাহারের জন্য তাকে ও তার বাবাকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে সিরাজুল ইসলাম সেলিনার বাবা এম এ সাত্তার, মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির বর্তমান চেয়ারম্যান জমিংথাংগা লুসাইসহ কয়েকজন লিজগ্রহীতার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলাটি অতিরিক্ত জেলা জজ ৫ম আদালতে বিচারাধীন রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজহারে সেলিনা অভিযোগ করেন, ২০২৫ সালের ২৯ জানুয়ারি সিরাজুল ইসলাম আমিন হোসেনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তার বাবার বাসায় গিয়ে স্বত্ব মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। পরে এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের সামনে মামলাসংক্রান্ত বিরোধের জেরে সিরাজুল ইসলাম মুহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামকে মারধর করে রক্তাক্ত জখম করেন। এ ঘটনায় তৌহিদুল ইসলাম থানায় অভিযোগ করেন। পরে প্রতিকার না পেয়ে ৬ আগস্ট ২০২৫ আদালতে কোতোয়ালি সিআর ১০৫৭/২০২৫ নম্বর মামলা করেন। মামলাটি ডিবি সিলেট তদন্ত করছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
সেলিনার অভিযোগ, সর্বশেষ গত ২৮ জুলাই মুখ্য জেলা জজ ২য় আদালতে পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির ভূমি-সংক্রান্ত স্বত্ব ৭৩/২৩ মামলার শুনানির সময় তার বাবার নিয়োজিত আইনজীবীকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ৩০ জুলাই তার বাবা আদালতে গেলে তাকেও মামলা প্রত্যাহারের জন্য আবার হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজহারে সেলিনা উল্লেখ করেন, স্বত্ব মামলা থেকে ১৮৫২২/০৬ নম্বর সাফকবলা দলিলটি রক্ষা করার জন্য পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ভাড়াটে খুনিদের দিয়ে গত ১২ আগস্ট সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে রায়নগরের মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দ্বিতীয় তলায় তার বাবা আব্দুস সাত্তার, মা সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাসা থেকে কাগজপত্র, জিডির কপি ও দলিলাদি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলামের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে সিলেট কোতোয়ালি থানার ওসি খান মো. মঈনুল জাকির বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হবে।
এজাহারে আটক বাবুলের নাম না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছে। সুতরাং অভিযোগে বাবুলের নাম না থাকা এবং হত্যাকাণ্ডে তার জড়িত থাকার বিষয়টি, দুটিই আমরা গুরুত্বসহকারে তদন্ত করবো।’
উল্লেখ্য, বুধবার (১২ আগস্ট) সকালে সিলেট নগরের রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসার দোতলা থেকে আব্দুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭২) ও গৃহকর্মী তাহমিনার (১৫) গলাকাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর ওইদিন বিকেলে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়া (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনির মৃত নূর মিয়া (কবিরাজ)-এর ছেলে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় বাবুল মিয়াকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানিয়েছিলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল জানিয়েছেন তিনি ওই বাসায় রং মিস্ত্রির কাজ করতেন। এই সুবাদে গৃহকর্মী তাহমিনার সঙ্গে তার পরিচয় ও যোগাযোগ হয়।
তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ঘটনার দিন গৃহকর্মী তাহমিনার কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে বাবুল প্রথমে তাকে এবং পরে একে একে আরও দুজনকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন। এরপর বারান্দা দিয়ে পালিয়ে যান।
জমি বিরোধ, হত্যা মামলা, এজহার, আটক, বাবুল মিয়া, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ