০৫ আগস্ট ২০২৬

রাজনীতি / সরকার

রুদ্ধশ্বাস ৫ আগস্ট আজ: যেভাবে শেষ হলো টানা দেড় দশকের আওয়ামী লীগ শাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৫ আগস্ট, ২০২৬ ১১:০৪ পূর্বাহ্ন


২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, সোমবার। কোটা সংস্কার ও সরকার বিরোধী আন্দোলনে উদ্বেগ, উৎকণ্টা ও আতঙ্কের মধ্য দিয়ে দিনের শুরু হলেও সাধারণ মানুষ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাস এক অভূতপূর্ব বাঁক নিতে যাচ্ছে।


কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটে যায় এক নাটকীয় পরিবর্তন। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেন এবং দেশ ত্যাগ করেন। শেখ হাসিনার নাটকীয় পদত্যাগ ও ‘এক কাপড়ে’ দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার সেই ঘটনা আজও দেশের মানুষের মনে এক মহানাটকের মতো জীবন্ত হয়ে আছে।


এই পরিবর্তনের পেছনে ছিল কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা কোটা সংস্কার আন্দোলন, যা পরবর্তীতে সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগ, সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ শেষ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে সরকারের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা সম্ভব হয়নি।


জুলাই মাসের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে অনেকটা নিরীহভাবেই রাজপথে নেমেছিল দেশের ছাত্রসমাজ। কিন্তু সেই আন্দোলন ঠেকাতে সরকারের শক্তিপ্রয়োগ পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে দেয়। বিশেষ করে রংপুরে শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর পরিস্থিতি সহিংস হয়ে ওঠে। একদিকে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরাও অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর শুরু করে। কোটাবিরোধী আন্দোলন একপর্যায়ে সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার রাস্তায় সেনাবাহিনী নামায় এবং দিন-রাত কারফিউ জারি করে। তবে কোনো বাধা মানেনি ছাত্র-জনতা। দেখা দেয় বাঁধভাঙা গণবিস্ফোরণ।


সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ৫ আগস্ট ‘লং মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকামুখী জনস্রোত ঠেকাতে আগের রাত থেকেই সারা দেশে কারফিউ জারির পাশাপাশি রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশপথে বসানো হয় কাঁটাতারের বেষ্টনী ও ভারী সাঁজোয়া যান। কিন্তু ৫ আগস্টের ভোরের আলো ফুটতেই সেই সব প্রশাসনিক হিসাব-নিকাশ ও নিরাপত্তার শক্ত বলয় ধুলোয় মিশে যেতে শুরু করে।

 

কোনো ধরনের ভয়ডরের তোয়াক্কা না করে ঢাকার চারপাশের উত্তরা, গাজীপুর, সাভার এবং দক্ষিণের যাত্রাবাড়ী ও সাইনবোর্ড এলাকা দিয়ে পঙ্গপালের মতো হাজার হাজার মানুষ ঢাকার কেন্দ্রের দিকে হাঁটতে শুরু করে। শাহবাগ, উত্তরার জসিমউদ্দীন, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ীর মোড়ে তৈরি হওয়া সেই মানবঢলের একটাই লক্ষ্য ছিল—ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু গণভবন। রাজপথের প্রতিটি মোড়ে মানুষ কারফিউর শৃঙ্খলা ভেঙে মিছিলে যুক্ত হতে থাকে। দেখতে দেখতে লাখ লাখ মানুষের এক উত্তাল সমুদ্রে পরিণত হয় ঢাকা শহর।


এ পরিস্থিতিতে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে সরকার প্রধানের পদত্যাগেই সব শেষ হয়নি। কারণ, সেই পদত্যাগের কোনো ঘোষণা তখনো শোনা যায়নি। আন্দোলনকারী জনতা তখনো রাস্তায়, এবার তাদের গন্তব্য গণভবন।


গণভবনের বাইরে তখন শোনা যাচ্ছিল হাজার হাজার বিক্ষুব্ধ জনতার বিকট গর্জন। চারপাশের চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপের মুখে অল্প সময়ের মধ্যে গণভবন ছাড়ার প্রস্তুতি নেন শেখ হাসিনা।


দুপুর আড়াইটার দিকে শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে অত্যন্ত গোপনীয়তায় গণভবন থেকে বের করে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে তোলা হয়। সেখান থেকে তাদের দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় কুর্মিটোলা বঙ্গবন্ধু বিমানঘাঁটিতে। সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি সি-১৩০জে পরিবহন বিমান। বিশেষ সেই সামরিক বিমানে চেপে দীর্ঘ দেড় দশকের শাসক শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।


একই সময়ে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের কথা জানানো হয়। আরও বলা হয়, শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনে কথা বলবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেই ফাঁকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে বিভিন্ন দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন সেনাপ্রধান।


টেলিভিশনে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর প্রচারিত হতেই সব বাধা ভেঙে হাজার হাজার মানুষ গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনের চত্বরে ঢুকে পড়ে। গণভবনের রাজকীয় বাগান, ঘরবাড়ি ও ফোয়ারা মুহূর্তের মধ্যে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।


এদিকে, ঢাকায় যখন সরকার পতনের ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন তার প্রতিফলন দেখা যায় সিলেটেও। সকাল থেকেই নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অবস্থান নেয় পুলিশ, র‍্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী। চৌহাট্টা, আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, কোর্ট পয়েন্ট ও বন্দরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। চৌহাট্টা শহীদ মিনার এলাকায় সোয়াট সদস্যদেরও সশস্ত্র অবস্থানে দেখা যায়।


তবে দুপুরের দিকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা একে একে অবস্থান গুটিয়ে নেন। বিভিন্ন সড়ক থেকে পুলিশ সদস্যরা ব্যারাকে ফিরে যান। এরপর রাজপথে নেমে আসেন হাজারো মানুষ।


বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নগরীর চৌহাট্টা, কোর্ট পয়েন্ট, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার এলাকায় বিজয় মিছিল বের হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমর্থক এবং সাধারণ মানুষ মিছিলে অংশ নেন। স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নগরীর প্রধান সড়কগুলো। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান হয়েছে—এমন অনুভূতি থেকে অনেককে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়।


শেয়ার করুনঃ

রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন

আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা, ছাত্র আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, কোটা সংস্কার আন্দোলন, ৫ আগস্ট

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ