০৫ আগস্ট ২০২৬

যাপিতজীবন / স্বাস্থ্য

সিলেটে ১৪ লাখ শিশুকে টিকাদানের পরও বেড়েই চলেছে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ৪ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৪১ অপরাহ্ন


সিলেট বিভাগজুড়ে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় গত আড়াই মাসে ১৪ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার দাবি করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। তবে তিন মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। বরং টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় টিকার কার্যকারিতা, রোগ শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।


স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০ এপ্রিল বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর পর থেকে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নতুন করে ৬৮১ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১১১ জনের। অথচ কর্মসূচি শুরুর আগে, অর্থাৎ ১৫ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত একমাসের বেশি সময়ে বিভাগে নিশ্চিত আক্রান্ত ছিলেন ৪৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল মাত্র পাঁচজনের।


এমন পরিসংখ্যানে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বাস্তবে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তাদের দাবি, হাসপাতালে নতুন রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর হার আগের তুলনায় কমেছে। পর্যাপ্ত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হলে সংক্রমণ আরও কমে আসবে।


অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, কমিউনিটিতে অনেক আক্রান্ত শিশু এখনো শনাক্তের বাইরে থাকায় সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। একজন হাম আক্রান্ত শিশু গড়ে ১৪ থেকে ১৬ জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন হলেও প্রায় ৫ শতাংশ মানুষের শরীরে প্রয়োজনীয় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয় না। শরীরের দুর্বল প্রতিক্রিয়া, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা নষ্ট হওয়া কিংবা প্রয়োগজনিত ত্রুটির কারণেও একটি অংশ অরক্ষিত থেকে যায়।


স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনু্যায়ী, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়তে শুরু করে। ৪ এপ্রিল সিলেট বিভাগে প্রথম ৩০ জন হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানানো হয়। তখন কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ওই সময় আক্রান্তদের মধ্যে সিলেটে ১০ জন, সুনামগঞ্জে ৭ জন, মৌলভীবাজারে ৮ জন এবং হবিগঞ্জে ৫ জন ছিলেন।


পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ২০ এপ্রিল সারাদেশের মতো সিলেটেও বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। কর্মসূচি শুরুর আগে বিভাগে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৪৫ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল পাঁচজনের।


কিন্তু এরপরও সংক্রমণ থামেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের দৈনিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, টিকাদান শুরুর পর তিন মাসের বেশি সময়ে নতুন করে ৬৮১ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১১১ জন।


সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংক্রমণ শুরুর পর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত বিভাগে মোট ১১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ১১০ জন হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন এবং ছয়জনের শরীরে পরীক্ষাগারে হাম নিশ্চিত হয়েছিল।


এ সময় চার জেলায় ল্যাব পরীক্ষায় মোট ৭২৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।


জেলাভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৩৪৬ জন আক্রান্ত এবং ৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিলেট জেলায় আক্রান্ত ২৪০ জন, মৃত্যু ৪০ জন। হবিগঞ্জে আক্রান্ত ৭৩ জন ও মৃত্যু ১২ জন। মৌলভীবাজারে আক্রান্ত ৬৭ জন এবং মারা গেছেন ১৩ জন।


স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট বিভাগের চার জেলায় ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ শিশুকে বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদানের আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। মঙ্গলবার পর্যন্ত সেখানে টিকা পেয়েছে ১৩ লাখ ৩২ হাজার ২০৮ শিশু, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১০ হাজার বেশি।


এছাড়া সিলেট সিটি করপোরেশন এলাকায় ৬৮ হাজার ৯৩৩ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য থাকলেও টিকা পেয়েছে ৬৯ হাজার ১৭৮ শিশু।


সব মিলিয়ে বিভাগ ও সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪ লাখেরও বেশি শিশুকে হাম-রুবেলার বিশেষ টিকা দেওয়া হয়েছে।


বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সিলেট প্রোগ্রাম অফিসার ডা. মোহাম্মদ আমানত উল্লাহ বলেন, টিকাদানের পরও অনেক আক্রান্ত শিশু শনাক্তের বাইরে থাকছে। ফলে তারা অজান্তেই অন্যদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিচ্ছে।


তিনি বলেন, একজন আক্রান্ত শিশু ১৪ থেকে ১৬ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই রোগ নিয়ন্ত্রণে কিছুটা সময় লাগবে। শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন হলেও সাধারণত ৯৫ শতাংশ মানুষের শরীরে কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়। বাকি প্রায় ৫ শতাংশ বিভিন্ন কারণে অরক্ষিত থেকে যায়।


সিলেটের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। আগে প্রতিদিন চার থেকে পাঁচজন পর্যন্ত মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এখন সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।  ‘হার্ড ইমিউনিটি’ অর্জিত হলে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও কমবে বলে তিনি মনে করেন।


তিনি আরও জানান, যেসব মা আগে হামের টিকা নেননি, তাদের নবজাতক শিশুরা এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও চা-বাগান অঞ্চলে টিকাদানের হার তুলনামূলক কম এবং সচেতনতার ঘাটতি থাকায় সেখানে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।


তবে শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিন্ন মত, টিকাদানের পাশাপাশি আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করা, চিকিৎসার আওতায় আনা এবং দুর্গম অঞ্চলে সচেতনতা বাড়ানো না গেলে সিলেটে হামের সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

সিলেট হাম, হাম-রুবেলা টিকা, সিলেট হাম পরিস্থিতি, হাম সংক্রমণ, হামে মৃত্যু, সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ, ডব্লিউএইচও, হাম টিকাদান কর্মসূচি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ