০২ আগস্ট ২০২৬

মানবিকতা / মানবিক আবেদন

চারবার মাতৃত্ব, চারবারই শোক: ইসরায়েলি হামলায় শেষ সন্তানও হারালেন ফাতিমা

সিলেট ভয়েস ডেস্ক

প্রকাশঃ ২ আগস্ট, ২০২৬ ১:৪৫ অপরাহ্ন


খোলা জানালার পাশে ছোট্ট একটি ঘরে, কম্বল ছাড়াই ঘুমিয়েছিল পনেরো মাস বয়সী জায়েদ নোফাল। গাজার ভ্যাপসা গরম থেকে বাঁচার আর কোনো উপায় ছিল না তার। রাত তিনটার দিকে আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে পরিবারটির বাড়িতে আঘাত হানে ইসরায়েলি বিমান হামলা। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায় শিশুটির ছোট্ট দেহ।


কয়েক মিটার দূরে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার ৩৮ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি মা ফাতিমা নোফাল। রক্ত আর ধুলোয় ঢাকা শরীরে, চারপাশে প্রতিবেশীদের চিৎকারের মধ্যে তিনি এমন এক ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হন, যা তিনি আগেও সহ্য করেছেন জায়েদ ছিল তার চতুর্থ সন্তান, যাকে ইসরায়েলি হামলায় হারালেন তিনি। এর আগে ২০২৩ সালে তার তিন ছেলে নিহত হয়েছিল।


আংশিকভাবে ধ্বংস হওয়া এই বাড়িটি ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছিল। হামলার খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা ছুটে আসেন পরিবারটির বাড়িতে।


মিডল ইস্ট আইকে ফাতিমা নোফাল বলেন, আমি এখনও বুঝে উঠতে পারছি না কী ঘটেছে। আমি এখনও গভীর ধাক্কার মধ্যে আছি। শুধু মনে আছে, হামলার কয়েক মিনিট আগে আমার ঘুম ভেঙেছিল। তীব্র গরমের কারণে আমি অন্য জায়গায় সরে গিয়েছিলাম, আমার ছোট্ট জায়েদকে জানালার পাশে রেখেই যাতে বাতাসে তার ঘুম ভালো হয়।


হামলায় আহত হলেও ফাতিমা জায়গা ছেড়ে যেতে রাজি হননি। প্রতিবেশীদের কাছে অনুরোধ করেন তার ছেলেকে খুঁজে বের করার জন্য।


তিনি বলেন, ঘরটি ধ্বংসস্তূপে ভরে গিয়েছিল, তারা তা সরিয়ে তাকে খুঁজতে শুরু করে।


শেষ পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ থেকে জায়েদকে উদ্ধার করা হয়, একটি হালকা কম্বলে জড়িয়ে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি।


জায়েদের মৃত্যু ফাতিমার মনে ফিরিয়ে আনে ২০২৩ সালের ১৩ অক্টোবরের সেই ভয়াবহ স্মৃতি, যেদিন এক ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার তিন ছেলে নিহত হয়েছিল। সেই হামলা থেকে বেঁচে ফেরেন কেবল তিনি ও তার দুই মেয়ে।


যুদ্ধের শুরুতে নিরাপদ ভেবে ফাতিমা ও তার পরিবার আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবির ছেড়ে উপকূলীয় শহর আল-জাওয়াইদার আল-সাওয়ারহা এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।


তিনি বলেন, আমরা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝতে পেরে পালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, কারণ আমরা ভেবেছিলাম সীমান্তের কাছে থাকার চেয়ে এটি নিরাপদ হবে। কিন্তু আমরা কখনও কল্পনাও করিনি যে, নিরাপত্তার আশায় যাওয়া জায়গাতেই আমি আমার তিন ছেলে এবং আমার স্বামীর পরিবারের বেশিরভাগ সদস্যের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করব।


সেই হামলায় নিহত হন ফাতিমার বড় ছেলে ১৬ বছর বয়সী আমিন, ১১ বছর বয়সী হামজা, এবং মাত্র ২২ দিন বয়সী নবজাতক আহমেদ। ফাতিমা ও তার দুই মেয়েও আহত হন সেই হামলায়। তাদের আশ্রয়স্থল ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে বারবার বাস্তুচ্যুত হতে হয় তাদের।


গাজার প্রায় সব মানুষের মতোই, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফাতিমাও মাসের পর মাস বাস্তুচ্যুতি, ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছেন।


তিন ছেলেকে হারানোর দশ মাস পর, যখন তিনি জানতে পারেন তিনি গর্ভবতী, তখন তার জীবনে আশার আলো ফিরে আসে। ছেলে সন্তান হবে জেনে তার আনন্দ আরও বেড়ে যায়।


২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল, চলমান যুদ্ধের মধ্যেই জায়েদের জন্ম দেন ফাতিমা। তিনি বিশ্বাস করতেন, হারানো সন্তানদের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ করতেই এসেছে জায়েদ।


ফাতিমা স্মরণ করে বলেন, ❝যুদ্ধের সময় আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল জায়েদের জন্ম। তার আগমন গোটা পরিবারে অসীম আনন্দ বয়ে এনেছিল; দীর্ঘ মাস ও রাতের যন্ত্রণা আর কান্নার পর আমাদের জীবন আলোকিত করতে আসা এক ছোট্ট বিস্ময় হিসেবে সবাই তাকে উদযাপন করেছিল।❞


স্বজনেরা প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার মৃত ভাইদের একজনের নামে নতুন শিশুর নামকরণ করতে, কিন্তু ফাতিমা তা প্রত্যাখ্যান করেন।


তিনি বলেন, আমি চেয়েছিলাম তার নিজের একটি নাম ও নিজের একটি নিয়তি থাকুক।


সময়ের সঙ্গে জায়েদ হয়ে উঠেছিল পরিবারের ‘আনন্দের উৎস’। তার বোনেরা তার প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েছিল।


ফাতিমা বলেন, যখনই আমি তাকে টিকা বা চেকআপের জন্য ক্লিনিকে নিয়ে যেতাম, তার বোনেরা সিঁড়িতে বসে তার জন্য অপেক্ষা করত। এমনকি কয়েক ঘণ্টার জন্যও তার থেকে দূরে থাকা তারা সহ্য করতে পারত না।


পায়ের পোড়া ক্ষত থেকে সেরে ওঠার সময় মিডল ইস্ট আইয়ের সঙ্গে কথা বলেন ফাতিমা। তার বড় মেয়ে বারা'আ সামান্য আহত হলেও, ছোট মেয়ে লিনা মাথায় গুরুতর আঘাত পেয়েছে।


তিনি বলেন, ❝লিনা এখনও হাসপাতালে আছে। আমি তাকে দেখতে গেলে, সে প্রথমেই জায়েদের কথা জিজ্ঞাসা করে। সে তখনও আহত অবস্থায় ছিল বলে আমি তাকে সত্যিটা বলতে পারিনি। আমি বলেছি, সে ভালো আছে এবং তার জন্য অপেক্ষা করছে। ও যখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবে, তখন কীভাবে তাকে সত্যিটা বলব, জানি না।❞


ফাতিমা বলেন, জায়েদ যে শৈশব কখনও পায়নি, তা তার শোককে আরও গভীর করে তুলেছে।


তিনি বলেন, যেদিন তাকে হত্যা করা হয়, সেদিন বিকেলে সে অস্থির হয়ে বাইরে যেতে চাইছিল। আমি তার বোনদের বলেছিলাম, আমি কতটা চাই তাকে বাইরে নিয়ে যেতে, কিন্তু বাচ্চাদের খেলার মতো কোনো জায়গা আর অবশিষ্ট নেই।


তার পুরো জীবনটাই কেটেছে ঘরের ভেতরে। এমনকি তার চাচাতো ভাইবোনেরাও ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হয়েছিল, তাই তার সঙ্গে খেলার মতো কেউ ছিল না।


গাজার ওপর দুই বছরের গণহত্যামূলক যুদ্ধ থামাতে গত বছর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, ইসরায়েল প্রায় প্রতিদিনই গাজায় বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে।


যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সব মিলিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।


এই ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর মিছিল থেকে রেহাই পায়নি শিশুরাও। জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) জুন মাসে জানায়, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে গাজায় প্রায় ২৬০ শিশু নিহত হয়েছে।


ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার এই পরিস্থিতিকে যুদ্ধবিরতির নিষ্ঠুর ও মারণ বিভ্রম বলে বর্ণনা করে বলেন, গড়ে প্রতিদিন একটি করে শিশু নিহত হচ্ছে।


নিজের সন্তানদের মৃত্যু প্রত্যক্ষ করার পর ফাতিমা মনে করেন, ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক বিশেষ করে নারী ও শিশুরা ইসরায়েলের ইচ্ছাকৃত লক্ষ্যবস্তু।


তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমরা দেখেছি, বেশিরভাগ হতাহতের মধ্যে নারী ও শিশুই বেশি। ইসরায়েল আমাদের মেরে ফেলতে বদ্ধপরিকর, আর এ জন্য তাদের কোনো ব্যাখ্যারও প্রয়োজন হয় না।


যেদিন আল-বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে জায়েদ নিহত হয়, সেদিনই আল-মাওয়াসিতে তার চাচার তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয় নয় বছর বয়সী রাতিল আল-আবাদলা। যুদ্ধের বাস্তবতা থেকে সাময়িক মুক্তি দিতে মা ও ভাইবোনদের সঙ্গে দুই দিন আগে চাচার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল সে।


রাতিলের বাবা আবদুল্লাহ আল-আবাদলার একটি ভিডিও অনলাইনে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তিনি মেয়ের নিথর দেহ কোলে নিয়ে জিজ্ঞাসা করছিলেন, তার সন্তান এমন পরিণতি পাওয়ার মতো কী করেছিল।


জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যে ইসরায়েলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এমন আচরণকেই তারা ইসরায়েলের গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


তবে ফাতিমার জন্য, কোনো প্রতিবেদন বা পরিসংখ্যানই জায়েদ বা তার আগে হারানো তিন সন্তানকে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।


হাসপাতালে আহত মেয়ের পাশে বসে তিনি এখন এক নতুন সংগ্রামের মুখোমুখি থাকার জায়গা খুঁজে বের করা এবং তার মেয়েকে জানানো যে তার প্রিয় ছোট্ট ভাই আর কখনও ফিরবে না।


তিনি বলেন, বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে, আর জানি না কে তা নেভাবে।


শেয়ার করুনঃ

মানবিকতা থেকে আরো পড়ুন

গাজা, ফিলিস্তিন, ইসরায়েলি হামলা, শিশু, মৃত্যু, যুদ্ধ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ