০৮ জুলাই ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

ঝুঁকিপূর্ণ ২৫৯ স্কুলভবনে পাঠদান, নিরাপত্তা ঝুঁকিতে হবিগঞ্জের ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী

মো. সেলিম মিয়া , হবিগঞ্জ

প্রকাশঃ ৭ জুলাই, ২০২৬ ১২:৪৯ অপরাহ্ন


কখনো ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, কখনো ফাটল ধরা দেয়াল থেকে ঝরে পড়ছে ইট-সুরকি। ঝড়-বৃষ্টির সময় আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়। তবু এসব জরাজীর্ণ ভবনেই প্রতিদিন ক্লাস করছে হবিগঞ্জ জেলার প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী। জেলার ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫৯টির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে ২০টি ভবনকে চিহ্নিত করা হয়েছে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে।


সম্প্রতি মাধবপুর উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষের ছাদের অংশ ধসে একজন কর্মচারী আহত হওয়ার ঘটনায় জেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।


গত ২০ জুন সকাল ১১টার দিকে মাধবপুর উপজেলার আন্দিউড়া ইউনিয়নের হরিশ্যামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি শ্রেণিকক্ষের ছাদের অংশ ধসে পড়ে। এতে বিদ্যালয়ের দপ্তরী প্রকাশ দাস আহত হন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। এ ঘটনার পর জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।


ঘটনার পর হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট রুহি দাস স্বপ্রণোদিত হয়ে হবিগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে জেলার ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর তালিকা চেয়ে আবেদন করেন।


জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সরেজমিনে দেখা গেছে, হরিশ্যামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো একই ঝুঁকিতে চলছে আরও অনেক বিদ্যালয়।


এমন একটি বিদ্যালয় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরাঙ্গের চক বাবুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৯৫ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রায় ৩৪ বছর আগে নির্মিত বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনের বিভিন্ন স্থানে ক্ষয় দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি ভবনের ছাদ থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. সাদি আহত হয়। এরপর থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।


চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী নাজমা আক্তার বলে, ঝড়-তুফান শুরু হলে তারা ভবন ধসে পড়ার ভয় পায়। অনেক সময় পাশের একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ ছাদের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এতে মো. সাদি নামে এক শিক্ষার্থী আহত হয়। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আসতে হয়।’


জেলার প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি সোমেশ্বরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও একই রকম নাজুক। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে একটি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়।


বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপঙ্কর রায় বলেন, ‘ভবনের বিভিন্ন স্থানে ফাটল দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষের ভেতরে পানি পড়ে। ছাদের লিন্টেল ও পলেস্তারা খসে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের কারণে অভিভাবকদের উদ্বেগ বাড়ছে, পাশাপাশি দিন দিন শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে যাচ্ছে।’


হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৫২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৯টি বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা এসব বিদ্যালয়ের অধিকাংশে প্রায় ২৫ বছরেও নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়নি।


জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০টি বিদ্যালয়কে অতি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে হবিগঞ্জ সদরে ৩টি, লাখাইয়ে ৩টি, বাহুবলে ৩টি, মাধবপুরে ৩টি, চুনারুঘাটে ৩টি, নবীগঞ্জে ২টি, বানিয়াচংয়ে ১টি, আজমিরীগঞ্জে ১টি এবং শায়েস্তাগঞ্জে ১টি বিদ্যালয় রয়েছে।


এসব ঝুঁকিপূর্ণ ও অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ে বর্তমানে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ফলে প্রতিদিনই নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পাঠদান ও পাঠগ্রহণ চলছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।


হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহ আলম বলেন, ‘জেলার যেসব বিদ্যালয়ের ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেসব বিদ্যালয়ে আগামী অর্থবছরে নতুন ভবন নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

হবিগঞ্জ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝুঁকিপূর্ণ স্কুল ভবন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়, ৩৫ হাজার শিক্ষার্থী, প্রাথমিক শিক্ষা, হবিগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, মাধবপুর, হরিশ্যামা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ