বজ্রপাতের ‘হটস্পট’ হাওরাঞ্চল, সতর্কবার্তা পৌঁছানোই বড় চ্যালেঞ্জ
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ৬ জুলাই, ২০২৬ ১০:৪৩ অপরাহ্ন
হাওরের বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে আকাশ কালো হয়ে এলেও জীবিকার তাগিদে মাঠ ছাড়তে পারেন না কৃষক-শ্রমিকরা। আর ঠিক সেই সময়েই নেমে আসা বজ্রপাত কেড়ে নিচ্ছে তাজা প্রাণ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন শুধু প্রাক-বর্ষা নয়, পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়েই বাড়ছে বজ্রপাতের ঘটনা। ফলে প্রতিবছরই বাড়ছে প্রাণহানির আশঙ্কা।
গত ২৮ জুন আন্তর্জাতিক বজ্রপাত নিরাপত্তা দিবস পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘শুনলে বজ্রধ্বনি, ঘরে যাই তখনই’। প্রতিপাদ্য বিষয়টিই এখন হাওরের কৃষকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বজ্রপাতের সতর্কবার্তা হাওরাঞ্চলে পৌঁছানোর প্রতিবন্ধকতার কারণে বজ্রপাতে প্রাণহানি বাড়ছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত এক যুগে দেশে বজ্রপাতে মারা গেছেন ৩ হাজার ৮৬০ জন মানুষ।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বজ্রপাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে ২০২০ সালে ৪২৭ জন। এ ছাড়া ২০১৫ সালে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৫৯ জন, ২০১৯ সালে ৪০১ জন, ২০২১ সালে ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জন নিহত হয়েছেন। চলতি বছরের ১৪ জুন পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছেন ১৩২ জন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা রাইমসের গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতি এক হাজার বর্গকিলোমিটারে বজ্রপাতে মৃত্যুর হারে বাংলাদেশ শীর্ষে। বৈশ্বিক হিসাবেও বার্ষিক বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যায় ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান।
সম্প্রতি আবহাওয়া অধিদপ্তরে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় রাইমসের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ খান মো. গোলাম রাব্বানী জানান, বর্তমানে ‘কন্টিনিউইং কারেন্ট’ বা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহযুক্ত বজ্রপাতের ঘটনা বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাতের তাপমাত্রা প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
তিনি আরও জানান, ‘পজিটিভ লাইটনিং’ বা শক্তিশালী ধনাত্মক বজ্রপাতের ঝুঁকিও বাড়ছে। এ ধরনের বজ্রপাত ঝড়ের মূল মেঘ থেকে অনেক দূরেও আঘাত হানতে পারে—সাধারণ মানুষের কাছে যা ‘বিনা মেঘে বজ্রপাত’ নামে পরিচিত।
জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, একসময় প্রাক-বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে বেশি বজ্রপাত হতো। এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়েই বজ্রপাত হচ্ছে।
রাইমসের গবেষণায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে বজ্রপাতের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা দেশের অন্যতম বড় বজ্রপাতের ‘হটস্পট’। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ সদর, বিশ্বম্ভরপুর, নেত্রকোণা ও মৌলভীবাজারেও বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা কৃষক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সেই বার্তা সময়মতো পৌঁছায় না।
সেভ দ্য সোসাইটি অ্যান্ড থান্ডারস্টোর্ম অ্যাওয়ারনেস ফোরামের (এসএসটিএএফ) সাধারণ সম্পাদক রাশিম মোল্লা বলেন, বজ্রপাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন মাঠের কৃষকরা। অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা আগে তাদের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া গেলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, বজ্রপাতের হটস্পট এলাকাগুলোতে মসজিদের মাইক বা কমিউনিটি পর্যায়ের ঘোষণার মাধ্যমে কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে এক থেকে চার ঘণ্টা আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে সেই তথ্য দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যাবে না।
বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে এসএসটিএএফ। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঠ্যপুস্তকে বজ্রপাত সচেতনতা অন্তর্ভুক্ত করা, দ্রুত পূর্বাভাস মাঠপর্যায়ে প্রচারের ব্যবস্থা করা, কৃষক ও সাধারণ মানুষের প্রশিক্ষণের আয়োজন, মাঠে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা।
বজ্রপাত, হটস্পট, হাওরাঞ্চল, সুনামগঞ্জ