০৭ জুন ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য / প্রত্নতত্ত্ব

ঝুঁকিতে ১৮ শতকে নির্মিত জৈন্তাপুরের ‘ঢুপির সরাইখানা’, সংরক্ষণের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ১০:২০ অপরাহ্ন

ছবিঃ রাজা রামসিংহের নির্মিত ‘ঢুপির সরাইখানা’ ; সিলেট ভয়েস

বাংলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জৈন্তিয়া রাজ্যের রাজা রামসিংহের নির্মিত স্থাপনাগুলোর মধ্যে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার ‘ঢুপির সরাইখানা’ অন্যতম। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। 

 

সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই সরাইখানা কেবল একটি বিশ্রামাগার নয়, বরং এটি অতীতের যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং ধর্মীয় যাত্রাপথের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

 

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৯৭ সালে ঢুপির মঠ নির্মাণের সময়ই এই সরাইখানাটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরাইখানাটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য ছিল দূর-দূরান্ত থেকে আগত পথিক, ব্যবসায়ী, পূণ্যার্থী এবং রাজকর্মচারীদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক বিশ্রামের ব্যবস্থা করা। সে সময়ের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জৈন্তিয়া অঞ্চলের সমতল এলাকায় নৌপথই ছিল প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। মানুষ নৌকা বা ভেলার মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করতো।

 

এই নৌপথের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ঢুপি গ্রামের সারীঘাট। সারী নদীর সঙ্গে দুটি ছোট নদীর সংযোগস্থলে অবস্থিত এই ঘাটটি ছিল জৈন্তিয়া অঞ্চলের সবচেয়ে ব্যস্ত নৌ-বন্দর। দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের মানুষ এখানে এসে নৌযান থেকে নেমে কয়েক মাইল পথ হেঁটে রাজধানীতে যেত। একইভাবে, ফেরার সময়ও তারা এই পথই অনুসরণ করত। সারীঘাট ছিল বাণিজ্যিক বন্দরনগরী। ব্যবসায়ীরা পাহাড়ি এলাকা থেকে সংগৃহীত বিভিন্ন পণ্য এখানে এনে নৌকায় তুলে দেশের অন্য অঞ্চলে সরবরাহ করতেন।

 

এদিকে শুধু ব্যবসায়ী নয়, ধর্মপ্রাণ পূণ্যার্থীরাও এই পথ ব্যবহার করতেন। তারা ঢুপির মঠ বা রামেশ্বর শিব মন্দিরে পূজা দিতে এসে সারীঘাটে নামতেন। এখানে প্রতিদিন বহু মানুষের আনাগোনা ছিল। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে রাজা রামসিংহ উন্নত মানের বিশ্রামাগার হিসেবে এই সরাইখানা নির্মাণ করেন।

 

সরাইখানাটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত ও দৃষ্টিনন্দন। ঢুপির পাহাড়ের পাদদেশে নির্মিত এই স্থাপনায় একসাথে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন মানুষের থাকার ব্যবস্থা ছিল। এটি মূলত একটি দোচালা ঘর, যার পূর্বদিকে একটি বারান্দা রয়েছে। বারান্দার পাঁচটি খিলানে সূক্ষ্ম কারুকাজ দেখা যায়, যা সে সময়ের স্থাপত্যশৈলীর উৎকর্ষকে নির্দেশ করে। দক্ষিণ দিকের দেয়ালেও চমৎকার নকশা খোদাই করা আছে। স্থাপনাটির নির্মাণশৈলী এবং ব্যবহৃত উপকরণ এতটাই মজবুত ছিল যে ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পেও এটি অক্ষত থাকে।

 

তবে সময়ের সাথে সাথে কিছু পরিবর্তন ঘটেছে। সরাইখানার সঙ্গে সংযুক্ত একটি পাথরে বাঁধানো জলাধার ছিল, যা অতিথিদের গোসল ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হতো। ব্রিটিশ আমলে সিলেট-শিলং সড়ক নির্মাণের সময় এই জলাধারটি ভরাট করে তার উপর দিয়ে রাস্তা তৈরি করা হয়। ফলে সরাইখানার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

 

বর্তমানে সিলেট-শিলং সড়কের বাংলাদেশ অংশটি সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক নামে পরিচিত। এই মহাসড়ক প্রশস্ত করার সময় সরাইখানাটি ভেঙে ফেলার আশঙ্কা দেখা দেয়। কিন্তু স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে কর্তৃপক্ষ ঘরটিকে অক্ষত রেখে রাস্তার দুই পাশে দুটি আলাদা লেন নির্মাণ করে। ফলে এখন যানবাহন সরাইখানার দুই পাশ দিয়ে চলাচল করে, যা একদিকে যেমন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে দৃশ্যমান রেখেছে, অন্যদিকে এটিকে ঝুঁকির মধ্যেও ফেলেছে।

 

ভারী যানবাহনের চাপ ও দুর্ঘটনার সম্ভাবনা এই মূল্যবান প্রত্নসম্পদের জন্য একটি বড় হুমকি। যথাযথ সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি ভবিষ্যতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে এই সরাইখানাকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। 

 

তাদের দাবি, জৈন্তিয়া রাজ্যের প্রাচীন সরাইখানা নিয়ে তাদের মধ্যে নানা গল্প ও মতামত প্রচলিত আছে। তাই ঐতিহাসিক এই ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় লোকজন। 

 

এদিকে সরাইখানা নিয়ে তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও আগ্রহ বাড়ছে। তাদের মতে, ঢুপির সরাইখানা শুধু একটি পুরনো স্থাপনা নয়, বরং জৈন্তিয়া রাজ্যের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এজন্য সরাইখানাটি দ্রুত  সংস্কার করে রক্ষণাবেক্ষণের দাবি জানান তারা।

 

গবেষক, লেখক  ও পরিবেশপ্রেমী আসিফ আযহার বলেন, ‘ঢুপির সরাইখানা শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জীবন্ত সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটিকে জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে তুলে ধরা জরুরি।’


শেয়ার করুনঃ

ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন

ঢুপির সরাইখানা, জৈন্তাপুর, জৈন্তিয়া রাজ্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নঐতিহ্য সংরক্ষণ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ