ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছাতকের ১৭৬ বছরের ঐতিহাসিক ‘ইংলিশ টিলা’
ইতিহাস-ঐতিহ্য
প্রকাশঃ ২৪ মে, ২০২৬ ৫:০৮ অপরাহ্ন
একসময় সিলেটের মুসলিম সমাজ ছিল শিক্ষা, সংস্কৃতি, সম্পদ ও জ্ঞানচর্চায় সমৃদ্ধ। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে মুসলমানদের আগমনের পর থেকে দীর্ঘ কয়েকশ বছর ধরে এ অঞ্চলে মুসলিম সমাজের একটি শক্তিশালী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে ওঠে। কিন্তু ১৭৬৫ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠার পর সেই চিত্র দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে।
ব্রিটিশ শাসকদের মুসলিমবিরোধী মনোভাব, প্রশাসনিক বৈষম্য এবং মুসলমানদের একাংশের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনীহা— সব মিলিয়ে সিলেটের মুসলিম সমাজ ক্রমেই পিছিয়ে পড়ে। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি অংশ ব্রিটিশ শাসকদের আনুকূল্য পেয়ে প্রশাসন, জমিদারি ও শিক্ষাক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয়।
ফলে একসময়কার সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারগুলোর অনেকেই অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। রক্ষণশীলতা ক্রমশ সমাজকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। বিশেষ করে মুসলিম নারীদের জীবন হয়ে ওঠে চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
আজ থেকে প্রায় একশ বছর আগেও সিলেটের মুসলিম নারীদের প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে যোগ দেওয়ার কোনো সামাজিক রেওয়াজ ছিল না। ঘরোয়া কোনো অনুষ্ঠানেও তাদের অংশ নিতে হতো বোরকা পরে, চিক বা পর্দার আড়ালে বসে। জনসমক্ষে নারীর উপস্থিতিকে তখন সমাজের বড় একটি অংশ নেতিবাচক চোখে দেখত। ঠিক এমন এক সময়েই বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে আবির্ভূত হন কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতা, গান ও লেখনী শুধু সাহিত্যেই নয়, সমাজচিন্তা ও মানুষের মননেও সৃষ্টি করে প্রবল আলোড়ন।
নজরুলের সাম্যবাদী চিন্তা, ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নারী স্বাধীনতা নিয়ে উচ্চারণ সে সময়ের রক্ষণশীল মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেক মাওলানা তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেন। প্রকাশ্যে তার গান ও কবিতার বিরোধিতা করা হয়। একই সঙ্গে কিছু গোঁড়া হিন্দু সমাজও তার চিন্তাধারাকে ভালো চোখে নেয়নি।
কিন্তু বিরোধিতা নজরুলকে থামাতে পারেনি। বরং তার বিদ্রোহী কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ে বাংলার শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। তরুণ সমাজের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন নতুন যুগের প্রতীক। সেই প্রভাব এসে পৌঁছায় সুরমা উপত্যকাতেও। সিলেটে গড়ে ওঠে নজরুলপ্রেমীদের শক্তিশালী বলয়। প্রগতিশীল সাহিত্যপ্রেমীরা তাকে সিলেটে আনার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন।
১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস। সিলেটে আয়োজন করা হয় আসাম প্রাদেশিক মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সম্মেলন। এ উপলক্ষে আমন্ত্রণ জানানো হয় বাংলার তিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিক্ষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক-কে। সম্মেলনের স্থান নির্ধারণ করা হয় শহরের রতনমণি লোকনাথ টাউন হল।
সম্মেলন ঘিরে তখন সিলেটজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। ছাত্রনেতারা দিনরাত কাজ করছেন অনুষ্ঠান সফল করতে। শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন মহকুমা ও থানাতেও চলছিল প্রস্তুতি। এ সময় আয়োজকেরা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন সম্মেলনে নারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার উদ্যোগ।
তৎকালীন সামাজিক বাস্তবতায় মুসলিম নারীদের জনসমক্ষে আনা ছিল অত্যন্ত কঠিন বিষয়। তাই আয়োজকেরা নারীদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা করেন। চারদিকে চিক দিয়ে ঘেরা হয় নির্ধারিত স্থান। পরিকল্পনা ছিল, বোরকা পরে নারীরা সেখানে বসে অনুষ্ঠান দেখবেন। সেই আমন্ত্রিত নারীদের মধ্যে ছিলেন জোবায়দা চৌধুরী ও বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী।
তখনও সমাজে পর্দাপ্রথা ছিল কঠোরভাবে প্রচলিত। নারীদের অনেকেই ঘরের বাইরে যেতেন না। গেলেও সম্পূর্ণ পর্দার আড়ালে থাকতে হতো। সম্মেলনের দিন নির্ধারিত আসনে বোরকা পরে বসেন নারীরা। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন নজরুল, ড. শহীদুল্লাহ, ফজলুল হকসহ বিশিষ্টজনেরা। জোবায়দা চৌধুরীর পিতা খান বাহাদুর সরাফত আলী চৌধুরীও ছিলেন অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শুরু হয় নজরুলের কণ্ঠে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে।
আর ঠিক তখনই ঘটে যায় এক ঐতিহাসিক ঘটনা।
সবাই বিস্ময়ে দেখেন নারী ও পুরুষের মাঝখানে টানানো চিকের পর্দা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, জোবায়দা চৌধুরী নিজেই খুলে ফেলেছেন তার বোরকা। এরপর তিনি গিয়ে বসেন সাধারণ দর্শকদের সারিতে।
তৎকালীন মুসলিম সমাজের বাস্তবতায় এটি ছিল এক অবিশ্বাস্য বিদ্রোহ। ঘটনায় উপস্থিত অনেকেই হতবাক হয়ে পড়েন। কেউ কেউ একে সামাজিক বিপ্লব বলেও অভিহিত করেন। পরবর্তীতে অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাশ তার ‘সিলেটে নজরুল’ গ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ করে লিখেছেন, সেদিন সিলেটের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল।
ঘটনার পর জোবায়দা চৌধুরীর পিতা খান বাহাদুর সরাফত আলী গর্বভরে বলেছিলেন, প্রথম সারিতে এতক্ষণ বসে রয়েছে সে কার মেয়ে? আমারই থার্ড ডটার। আজকে সিলেটের ইতিহাসে এক নতুন চ্যাপ্টার দেখা দিল। এই ঘটনাকে কেবল একটি সামাজিক সাহসিকতা বললে কম বলা হবে। এটি ছিল সিলেটের মুসলিম নারী সমাজের দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ জীবনের বিরুদ্ধে প্রতীকী বিদ্রোহ।
পরবর্তীতে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী সমাজ ও রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ধীরে ধীরে সিলেটের মুসলিম নারীরাও শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে শুরু করেন। সেদিনের সেই ছোট্ট পদক্ষেপই পরবর্তীতে বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। রক্ষণশীলতার কঠিন দেয়াল ধীরে ধীরে নরম হতে থাকে। নারীরা আন্দোলন-সংগ্রাম, শিক্ষা ও জনজীবনে অংশ নিতে শুরু করেন।
সিলেটে নজরুলের আগমন, মুসলিম নারী সমাজ, নতুন অধ্যায়ের সূচনা