ট্রাকের পেছনে ধাক্কা লেগে প্রাণ গেল মোটরসাইকেল আরোহী বাবা-ছেলের
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১৬ মে, ২০২৬ ৩:৫৭ অপরাহ্ন
সকালের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে একসময় সিলেটের বিশ্বনাথের বিভিন্ন বাজারে ভেসে আসত লোহা পেটানোর পরিচিত টুংটাং শব্দ। আগুনের দহন, হাতুড়ির ছন্দময় আঘাত আর কামারদের ঘামে ভেজা শ্রমে একসময় মুখর থাকত কামারপট্টি। দা, বঁটি, কুড়াল, কাস্তে কিংবা কৃষিকাজের নানা সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত থাকতেন কামার শিল্পীরা। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া আর বিদেশি পণ্যের দাপটে এখন সেই টুংটাং শব্দ প্রায় স্তব্ধ। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে বিশ্বনাথ উপজেলার বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা মাত্র দুই-তিনটি পরিবার এখনও পৈত্রিক এই পেশাকে আঁকড়ে ধরে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। একসময় যেখানে পুরো কামারপট্টি কর্মচঞ্চলে ভরা থাকত, সেখানে এখন দিনের বেশিরভাগ সময় কাটে অলস বসে থেকে।
এই শিল্পের সাথে জড়িত আছে এমন কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, কাঁচামালের সংকট, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এবং বিদেশি পণ্যের সহজলভ্যতায় ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এ শিল্প। কাঠের কয়লা, লোহা ও স্প্রিংসহ প্রয়োজনীয় কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন। কেউ শহরে গিয়ে দিনমজুর, কেউ আবার অন্য কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন।
বিশ্বনাথের দক্ষিণ মিরেরচর গ্রামের শত বছরের পুরনো কামার বাড়ির প্রবীণ কারিগর রমা কান্ত দে এখনও আগুন আর লোহার সঙ্গে যুদ্ধ করে জীবিকা চালিয়ে যাচ্ছেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও পৈত্রিক ঐতিহ্য ছাড়তে পারেননি তিনি।
রমা কান্ত দে বলেন, আমার দাদা-বাবা, চাচারা সবাই এই পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর আমরা তিন ভাই ও এক চাচাতো ভাই মিলে এখনও এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। ছোটবেলা থেকেই অভাবের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে বাবার সঙ্গে কামারের কাজে নেমে পড়ি। আগে কাজও ছিল অনেক, তবে আগের মতো এখন আর কাজ নেই। আগে দিন-রাত লোহা পিটিয়ে কাজ করতাম, এখন বেশিরভাগ সময় বসে থাকতে হয়। বিদেশি পণ্য বাজারে আসায় মানুষ দেশীয় জিনিস কম ব্যবহার করছে। অন্য কোনো কাজ জানি না, তাই কষ্ট করেও এই পেশা ধরে আছি।
তার সাথে কথা বলে জানা যায়, রমা কান্তের পরিবারে সদস্য সংখ্যা আট, সকলেই কোনো না কোনোভাবে এই পেশার সঙ্গে জড়িত। বছরে বিশেষ করে কোরবানির ঈদ এবং অগ্রহায়ণ মাসে ধান কাটার মৌসুমে কিছুটা কাজের চাপ বাড়ে। তবে বছরের বাকি সময় কাটে অনিশ্চয়তায়।
কামারপট্টির আরেক কারিগর অধির চন্দ্র ধর জানান, একসময় তাদের এলাকায় ছয়-সাতটি পরিবার এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। এখন মাত্র দুটি পরিবার এই কাজের সাথে জড়িত আছে। তিনি বলেন,
এই পেশার বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ। অনেকেই বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় চলে গেছে। আমরা যারা আছি, তারাও খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।
সরেজমিনে পুরো কামারপট্টি ঘুরে দেখা গেছে, অর্থকষ্টে মানবেতর জীবনযাপন করছেন অনেক কামার পরিবার। পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে তাদের জন্য। তবুও পূর্বপুরুষের স্মৃতি আর ঐতিহ্য রক্ষার দায় থেকে তারা এখনও আগুনের পাশে দাঁড়িয়ে লোহা পেটাচ্ছেন।
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, এটি শুধু একটি পেশা নয়, বরং বাংলার গ্রামীণ ঐতিহ্যের অংশ। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং কাঁচামাল সরবরাহে সহায়তা।
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। প্রথম ধাপের কার্যক্রম শেষে দ্বিতীয় ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। কামার শিল্পীদের উন্নয়নের জন্যও প্রশিক্ষণ রয়েছে। তারা চাইলে সরকারিভাবে সহযোগিতা নিতে পারবেন।”
ঐতিহ্যবাহী কামার শিল্প, বিশ্বনাথ