জমি নষ্ট না করে কীভাবে বেশি ধান উৎপাদন সম্ভব
কৃষি
প্রকাশঃ ২৩ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২১ অপরাহ্ন
গত ২৫ বছরে বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ যুক্ত হয়েছে, যা দেশের প্রধান খাদ্য ধানের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। উৎপাদন বাড়লেও তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় ধীরগতির, ফলে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসইতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
২০০০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১২.৯ কোটি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭.৬ কোটিতে—অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশের বেশি বৃদ্ধি। একই সময়ে জাতীয় ধান উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩.৬ কোটি টন থেকে ৩.৭–৩.৯ কোটি টনে, যা খুবই সীমিত বৃদ্ধি নির্দেশ করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জমির সীমাবদ্ধতা, জলবায়ু চাপ এবং সম্পদের সংকট বৃদ্ধির কারণে গত এক দশকে ফলন বৃদ্ধির হার কমে গেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ধানের মোট চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে উৎপাদনে সামান্য ওঠানামাও বাজারদর ও আমদানিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট এই দীর্ঘমেয়াদি চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বোরো মৌসুমে তীব্র ডিজেল সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ঐতিহ্যবাহী সম্পদনির্ভর কৃষি পদ্ধতি মারাত্মকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। হাজার হাজার সেচ পাম্প বন্ধ হয়ে পড়েছে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলো উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে। এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে টেকসই কৃষিতে রূপান্তর আর ভবিষ্যতের লক্ষ্য নয়, বরং এখনই জরুরি প্রয়োজন। কম সম্পদ ব্যবহার করে বেশি ধান উৎপাদনের উপায় খুঁজতে আধুনিক ও সহনশীল কৃষি পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ধান উৎপাদন ও পরিবেশের সম্পর্ক যে বিপজ্জনক দ্বিমুখী পথে এগোচ্ছে, সেটিই বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে। উচ্চ ফলনের লক্ষ্যে প্রচলিত পদ্ধতি পরিবেশকে নানা দিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মিথেন নির্গমন: প্রচলিত ধান চাষে জমি দীর্ঘ সময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। এই অবস্থায় মাটির অণুজীব অক্সিজেন ছাড়া জৈব পদার্থ ভেঙে মিথেন (CH₄) গ্যাস তৈরি করে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক বেশি তাপধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন। বিশ্বব্যাপী কৃষি খাতে মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের প্রায় ১০–১২ শতাংশ আসে ধান চাষ থেকে, এবং বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য অবদানকারী।
ভূগর্ভস্থ পানির নিঃশেষ: শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান, যা দেশের মোট উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি, ব্যাপকভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। লাখ লাখ নলকূপ থেকে পানি উত্তোলনের ফলে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মতো এলাকায় পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। এই পানি তুলতে বিপুল জ্বালানি লাগে, যা কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন বাড়ায় এবং কৃষকদের জ্বালানি সংকটের ঝুঁকিতে ফেলে।
সার দূষণ ও নাইট্রাস অক্সাইড: রাসায়নিক সার, বিশেষ করে ইউরিয়ার অদক্ষ ব্যবহার থেকে নাইট্রাস অক্সাইড (N₂O) নির্গত হয়, যা আরেকটি শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস। অতিরিক্ত প্রয়োগের ফলে পুষ্টি উপাদান নদী ও জলাভূমিতে চলে গিয়ে পানির গুণগত মান নষ্ট করে এবং জলজ পরিবেশ ধ্বংস করে।
ইকোসিস্টেমের ক্ষতি: কৃষি জমি সম্প্রসারণের ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পায় এবং গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি নষ্ট হয়, যা প্রাকৃতিক কার্বন সংরক্ষণ, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ মৎস্যসম্পদ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তন ধান চাষকেই হুমকির মুখে ফেলছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি, ঘন ঘন বন্যা ও খরা, এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, চাষ মৌসুমে তাপমাত্রা বাড়লে বিশেষ করে বোরো ধানের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে লবণাক্ততা বেড়ে মাটির উর্বরতাও কমে যাচ্ছে।
তাহলে কীভাবে বাংলাদেশ পরিবেশের ক্ষতি না করে বাড়তি ধান উৎপাদন করবে? এর উত্তর হলো “টেকসই নিবিড়তা” অর্থাৎ বিদ্যমান জমি থেকেই বেশি উৎপাদন নিশ্চিত করা, পাশাপাশি পরিবেশগত চাপ কমানো। কৃষি বিশেষজ্ঞরা এ ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের কথা বলছেন।
জলবায়ু সহনশীল জাত: বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত ব্যবহার অত্যন্ত কার্যকর। এগুলো উপকূলীয় অঞ্চল ও হাওর এলাকার মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ফলন স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে।
স্মার্ট সেচ: অল্টারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং পদ্ধতিতে জমি সবসময় পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় না, ফলে পানি ব্যবহার কমে এবং মিথেন নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। সৌরচালিত পাম্প ও উন্নত জমি সমতলকরণের মাধ্যমে জ্বালানি খরচও কমানো যায়।
নির্ভুল সার ব্যবস্থাপনা: নির্দিষ্ট জমির চাহিদা অনুযায়ী সার প্রয়োগ, পাতার রঙ দেখে নাইট্রোজেন প্রয়োগ, এবং সমন্বিত মাটির উর্বরতা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সার ব্যবহারের দক্ষতা বাড়ানো যায়। এতে রাসায়নিক অপচয় ও নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন কমে।
সমন্বিত পোকা ব্যবস্থাপনা: জৈব পদ্ধতি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী কীটনাশক ব্যবহার করলে উৎপাদন বজায় রেখেই বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো যায়।
ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমানো: ধান কাটার পর শুকানো, সংরক্ষণ ও মাড়াইয়ের সময় বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়। আধুনিক মাড়াই যন্ত্র ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে বছরে লাখ লাখ টন ধান বাঁচানো সম্ভব।
যান্ত্রিকীকরণ: রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, কম্বাইন হারভেস্টারসহ আধুনিক যন্ত্র ব্যবহারে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ে এবং শ্রম সংকট মোকাবিলা করা যায়।
সুযোগভিত্তিক সম্প্রসারণ: বিদ্যমান জমিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নদীর চর ও উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন চাষাবাদের সুযোগ খোঁজা যেতে পারে, তবে সেখানে অবশ্যই জলবায়ু সহনশীল জাত ও সমন্বিত সেচব্যবস্থা ব্যবহার করতে হবে।
গত কয়েক দশকে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এটি বিশ্বে একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত। তবে প্রচলিত পদ্ধতিতে উৎপাদনের পরিবেশগত ও জ্বালানি ব্যয় এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এখন সময় এসেছে “যে কোনো মূল্যে উৎপাদন” নয়, বরং “বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে উৎপাদন” করার। বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন, সম্পদের দক্ষ ব্যবহার এবং শক্তিশালী কৃষি নীতির সমন্বয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সীমিত সম্পদের মধ্যেও উৎপাদন বাড়াতে পারবে এবং একই সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদও সংরক্ষণ করতে পারবে।
কৃষি, উৎপাদন, জমি, হাওর