সিলেটে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬ ১২:২১ অপরাহ্ন
নলখাগড়া, চাইল্যা বন, হিজল-করচসহ নানা প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, মাছ ও পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে খ্যাত বিশ্ব রামসার হেরিটেজ সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার আংশিক এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই হাওরে শীত মৌসুম এলেও এবার দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পরিযায়ী পাখির।
সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিবছর শীত মৌসুমের শুরুতেই ঝাঁকে ঝাঁকে পরিযায়ী পাখির আগমনে মুখরিত হয়ে উঠত টাঙ্গুয়ার হাওর। পাখির কোলাহলে প্রাণ ফিরে পেত হাওরপাড়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই আশানুরূপভাবে পরিযায়ী পাখির দেখা মিলছে না। চলতি শীত মৌসুমে পাখির উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। ফলে পাখির কলরবে মুখরিত হওয়ার পরিবর্তে নীরব ও ফাঁকা পড়ে আছে হাওরপাড়।
সচেতন মহলের মতে, অতীতে নির্বিচারে পাখি শিকারই পরিযায়ী পাখি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। যদিও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত দুই বছর ধরে পাখি শিকার অনেকাংশেই বন্ধ রয়েছে। সুনামগঞ্জের সাবেক জেলা প্রশাসক সাবিরুল ইসলাম দায়িত্ব গ্রহণের পর টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণ ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহযোগিতায় পাখি শিকারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এতে বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি শিকার নেই বললেই চলে।
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর আগেও তাহিরপুর উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার ও জেলা সদরে প্রকাশ্যে ও গোপনে পরিযায়ী পাখি বিক্রি হতো। বর্তমানে সে দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। একসময় দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আবাসন সংকট থাকা সত্ত্বেও দেশ-বিদেশের জীববৈচিত্র্যপ্রেমী পর্যটকরা টাঙ্গুয়ার হাওরে পাখি দেখতে আসতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিদেশি পর্যটক তো দূরের কথা, দেশীয় পর্যটকের উপস্থিতিও খুবই সীমিত।
প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রতিবছর শীতপ্রধান দেশ সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পরিযায়ী পাখিরা আশ্রয় নিত। খাবারে সমৃদ্ধ এই হাওর তাদের দীর্ঘ উড়াল শেষে নতুন প্রাণশক্তি জোগাত। বিশেষজ্ঞদের তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির মধ্যে ১ হাজার ৮৫৫ প্রজাতি পরিযায়ী। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২১৯ প্রজাতির পাখির উপস্থিতি ছিল। এর মধ্যে ৯৮ প্রজাতি পরিযায়ী, ১২১ প্রজাতি দেশি ও ২২ প্রজাতির হাঁসজাতীয় পাখি।
উল্লেখযোগ্য প্রজাতির মধ্যে ছিল বিরল প্যালাসেস ফিশিং ঈগল, মৌলভী হাঁস, পিয়ারী, কাইম, রামকুড়া, মাথারাঙ্গা, বালিহাঁস, লেঞ্জা, চোখাচোখি ও বেগুনি কালেম। বর্তমানে এসব পাখির উপস্থিতি নেই বললেই চলে বলে জানান টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের বাসিন্দা ও উন্নয়নকর্মী খসরুল আলম।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আহমদ কবির বলেন, গত দুই বছর ধরে শীত মৌসুমে টাঙ্গুয়ার হাওরে বিদেশি পর্যটকের আগমন একেবারেই বন্ধ। দেশীয় পর্যটকের সংখ্যাও খুব কম।
তাহিরপুর কয়লা আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি হাজি খসরুল আলম বলেন, ৪–৫ বছর আগে এক শ্রেণির অসাধু পাখি শিকারি ও ব্যবসায়ীর কারণে হাওরে পাখির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে যায়। একই সঙ্গে হিজল-করচ, নলখাগড়া ও চাইল্যা বনও প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে ইতিবাচক দিক হলো গত বছর থেকে টাঙ্গুয়ার হাওরের কোর ও বাফার জোনে সব ধরনের ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ করেছে জেলা প্রশাসন। এই নজরদারি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আবার পাখির আগমন বাড়বে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণে সরকার বিশেষ নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পর্যটন শিল্প বিকাশে সর্বোচ্চ নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
সুনামগঞ্জ, টাঙ্গুয়ার হাওর, পাখি, শীত মৌসুম, তাহিরপুর