১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / প্রকৃতি

হোতারা অধরা

যাদুকাটার পাড়ে ‘সোনার জমি’: ৫০ কোটি টাকার বালু লুট

আবির হাসান মানিক, তাহিরপুর, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১৫ অক্টোবর, ২০২৫ ৭:১০ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত বালুমহাল তাহিরপুরের যাদুকাটা নদী। এই বালুমহালের লাউড়েরগড় ও শাহিদাবাদ নামক এলাকা থেকে কয়েকদিনে দেদারসে বালু লুটের চিত্র দেখা গেছে। জানা গেছে, গত পাঁচ দিনে অন্তত ৫০ কোটি টাকার বালু উত্তোলন করা হয়েছে। 


৬ অক্টোবর উপজেলা প্রশাসন যাদুকাটা বালুমহাল-১ এর সীমা পুনঃনির্ধারণের পরপরই ওই এলাকায় বালু উত্তোলন শুরু হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনে নদীর পাড় কেটে সিলিকা বালু লুট করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট।


অবশ্য এ সময়ের মধ্যে বালুলুট ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ বেশ কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে কয়েকজন শ্রমিককে আটক ও জরিমানা করেছে। তবে অভিযানের বিষয়ে ভুক্তভোগী ও সচেতন মহলের অভিযোগ, অভিযানে শুধু সাধারণ শ্রমিকরাই ধরা পড়েছে। পেছনে মূলহোতাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।


অনুসন্ধানে জানা গেছে, যাদুকাটা নদী সংলগ্ন লাউড়েরগড় ও শাহিদাবাদ এলাকার অন্তত কয়েক ডজন খানেক দখলদার মিলেমিশে এই সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন। প্রতি নল (৩৬০ বর্গফুট) জমি বিক্রি করেছে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত। 


এসব জমি থেকে প্রতি ঘনফুট সিলিকা বালু বিক্রি হয়েছে ২০ টাকা দরে। এই সিন্ডিকেটে লাউড়েরগড় ও শাহিদাবাদ এলাকার অন্তত শতাধিক বাসিন্দা রয়েছে যাদের নদী সংলগ্ন খাস জমি নামমাত্র দখলে ছিল। 


তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খাস জমি থেকে সরাসরি বালু বিক্রি করেছেন আবার কেউ এককালীন টাকা নিয়ে চুক্তিতে বিক্রি করে দিয়েছেন। আর এ কয়েকদিনে ইজারা বহির্ভূত এসব জমি থেকে অন্তত এক থেকে দেড় কোটি ঘনফুট বালু লুটের হিসেব পাওয়া গেছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা।


আর এই সিন্ডিকেটের অগ্রভাগে কাজ করেছেন বলে যাদের নাম উঠে এসেছে, তাঁরা হলেন লাউড়েরগড় আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুল কাইয়ুম ও মাঈনউদ্দিন ওরফে খাজা মিয়া। 

এছাড়া লাউড়েরগড় এলাকায় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বা পদ পদবী রয়েছে এমন কিছু নেতার নামও উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। তবে তথ্য সংগ্রহের উৎসটি তাঁদের নাম বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। 


অভিযুক্ত আব্দুল কাইয়ূমের মোবাইল নম্বরটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। 


আরেক অভিযুক্ত মাঈনউদ্দিন ওরফে খাজা বলেন, ‘নদী পাড়ে কোনো জায়গা নেই আমার। দুষ্টু লোকেরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছে।’


এদিকে কিছুদিন আগেও বালুখেকোদের কাছে পাড় কেটে বালু উত্তোলনের হটস্পট ছিল ঘাগটিয়া (আদর্শ গ্রাম)। বিগত কয়েক বছর ধরে এ জায়গা থেকে বালুখেকোরা ধারাবাহিকভাবে বালু লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। বালু লুটেরাদের এমন কর্মকাণ্ডে আদর্শ গ্রামের অস্তিত্ব প্রায় বিলীনের পথে। 


সম্প্রতি বালুখেকোদের চোখ পড়েছে নদীর পূর্ব অংশ লাউড়েরগড় ও শাহিদাবাদ এলাকায়। এ দুটি স্থান থেকে গত ৫ দিনে বালু লুটের ভয়ংকর রূপ দেখা গেছে। বালুলুটেরাদের এমন অপকর্ম শুরু হলে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে লাউড়েরগড় এলাকার একাধিক বাসিন্দা এ প্রতিবেদককে বলেন, যাদুকাটা নদীর লাউড়েরগড় ও শাহিদাবাদ এলাকার যে অংশ থেকে অবৈধভাবে বালু লুট নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এককালে এই জায়গাটি কৃষি জমি ছিল। স্থানীয়রা এখানে আখ ও বাদাম করতো। পরে পাহাড়ি ঢলে জায়গাটিতে বালুর চর জেগে ওঠে। বছরের পর বছর ধরে জায়গাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। পাশে অবশ্য একটি খেলার মাঠ গড়ে উঠেছে। কিছুদিন আগে এই মাঠে একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট শেষ হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, খেলাধুলার জায়গাটা আর থাকবে না। বালু লুটেরেরা তাও শেষ করে ছাড়াবে।


স্থানীয়দের দাবি জানিয়েছেন, অভিযানে সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষদের হয়রানি না করে ওইসব লোকদের ধরা জরুরি যারা সরকারি খাস জমি নিজেদের মালিকানা দাবি করে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে দিয়েছে। 


এদিকে যাদুকাটা বালুমহালের ইজারাদার নাছির মিয়া জানিয়েছেন, পাড় কাটা বন্ধ রাখতে আমাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত ভলেন্টিয়ার নিয়োগ করে দিয়েছি। বালুখেকোদের প্রতিহত করতে গিয়ে তিনজন ভলেন্টিয়ারও আহত হয়েছে। গতকাল (রবিবার) নদীতে কেউ যেন অবৈধভাবে পাড় কেটে বালু উত্তোলন না করে সেজন্য মাইকিং করা হয়েছে। পাড়ে বাঁশের আড় দিয়ে বেড়াও দিয়েছে।


সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি অধিনায়ক লে. কর্ণেল জাকারিয়া কাদির জানিয়েছেন, বালুলুটের বিষয়টি ৯ অক্টোবর জেলা প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। আমরা বলেছি, বালুলুট ঠেকাতে পুলিশ, আনসার ও বিজিবির সমন্বয়ে একটি যৌথ ক্যাম্প বসানো জরুরি। যেখানে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কাজ করবেন।


তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক এ প্রতিবেদককে বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আসছে। নদী পাড় এলাকায় একটি স্থায়ী ক্যাম্প বসানোর জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে চিটি দেওয়া হয়েছে। যেন অবৈধভাবে বালু লুট ঠেকাতে আরো কার্যকরী অভিযান পরিচালনা করা যায়। তাছাড়া সম্প্রতি বালুলুট কান্ডে যারা জড়িত তাঁদের ব্যাপারে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

যাদুকাটা নদী, তাহিরপুর বালু লুট, সুনামগঞ্জ বালুমহাল, বালুখেকো সিন্ডিকেট, অবৈধ বালু উত্তোলন

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ