সিলেটে ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ২৯ এপ্রিল, ২০২৫ ৯:০৭ অপরাহ্ন
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত সিলেট ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে পর্যটনের অন্যতম হাব। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমনপিপাসুরা ভীড় জমান সিলেটে। বিশেষ করে ঈদ ও সাপ্তাহিক ছুটির দিনে পর্যটকদের উপচে পড়া ভীড় থাকে প্রকৃতি কন্যা সিলেটে।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা মাফিক উন্নয়নের অভাবে অপার সম্ভাবনার এই খাতটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে। পর্যটন সংশ্লিষ্টদের অব্যবস্থাপনা আর সমন্বয়হীনতায় ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না এই শিল্প। খোঁদ পর্যটন শিল্পের বিকাশে গঠিত বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন ঘটাতে পারেনি সিলেটের পর্যটনের।
উল্টো পাঁচ বছর আগে দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা তৈরি করেও তার বাস্তবায়ন করতে পারছে না সংস্থাটি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বগ্রহণের পর সেই মহাপরিকল্পনার খসড়াটি আবার পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই মহাপরিকল্পনায় আটকে আছে সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নও।
ট্যুরিজম বোর্ডের মহাপরিকল্পনায় সিলেটকে একটি সম্ভাবনাময় অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুসারে, সিলেট অঞ্চলকে সিলেট, হবিগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর এই চারটি ক্লাস্টারে ভাগ করে পর্যটন বিকাশের রূপরেখা প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিকল্পনায় সিলেট চারটি জেলা, ৪১টি উপজেলা ও একটি সিটি করপোরেশন এলাকার আরও ৭৮টি স্থানকে পর্যটন স্পট হিসেবে অন্তর্ভূক্ত করতে সুপারিশ হয়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব নীতি গ্রহণের মাধ্যমে সিলেটের পর্যটন শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তবে এজন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার।
ট্যুরিজম ডেভেলপার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সহসভাপতি মোহাম্মদ খতিবুর রহমান বলেন, একজন পর্যটক কোথাও ঘুরতে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরলে তার প্রভাব পড়বে এই শিল্পের বিকাশে। এজন্য একটি নিয়ম-নীতিমালা দরকার।
তিনি বলেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় স্পটে পর্যটকদেরও একটা নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার হিসাব থাকা দরকার। যাতে পরিবেশেরও ক্ষতি না হয় এবং পর্যটকরাও স্বাচ্ছন্দ্যে ঘুরে বেড়াতে পারেন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের আরও উদ্যোগী হতে হবে।
হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি ও পরিবেশকর্মী কাশমীর রেজা বলেন, প্রতিবছর সিলেট অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে অনেক প্রকল্পে হাতে নেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন চোখে দেখা যায় না। মহাপরিকল্পনাতেও সুনামগঞ্জকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এটাও কাজির গরুর মতো-কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।
সিলেটের জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, লালাখাল, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, শহীদ সিরাজ লেক (নিলাদ্রী লেক), ডলুরা শহীদ মিনার, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, কালাপাহাড়, হাম হাম জলপ্রপাত, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও হবিগঞ্জের কয়েকটি পর্যটন স্পট দেশের পর্যটকদের কাছে পরিচিত।
অথচ ট্যুরিজম উন্নয়ন বোর্ডের তালিকা অনুযায়ী সিলেটের চার জেলায় পর্যটন স্পট রয়েছে ১২৩টি। এর মধ্যে সিলেটে ৪৩টি সুনামগঞ্জে ২৭ টি, হবিগঞ্জে ২১ টি ও মৌলভীবাজারে ৩৬ টি।
ট্যুরিজম উন্নয়ন বোর্ডের সিলেট অঞ্চলের পর্যটন স্পটগুলোর অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনার একটি মূল্যায়ন ছকে দেখা যায়, ১২৩টি স্পটের মধ্যে ৪০টি স্পটই অনুন্নত। আর ৭৭টির অবস্থা মোটামুটি। এ মূল্যায়ন ছকে মাত্র ৬টি স্পটকে ‘ভালো‘ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তথ্যই বোঝায় যে, বেশিরভাগ এলাকাই উন্নয়নের মূল স্রোতের বাইরে রয়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসনও সব সময় উল্লেখযোগ্য কিছু পর্যটন স্পট নিয়ে কাজ করে। এর বাইরে তালিকায় থাকা পর্যটন স্পটগুলো নিয়ে কোনো কাজ করা হয় না।
অন্যদিকে আলোচনায় থাকা পর্যটন স্পটগুলোর উন্নয়নও হয়নি আশানুরূপভাবে। যেসব উন্নয়ন হচ্ছে তা কেবল স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ‘সুবিধাভোগীদের‘ স্বার্থে। পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে বিশেষ কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি এ যাবৎকালে। হয়নি যোগাযোগ ব্যবস্থারও কোনো উন্নয়ন। যার কারণে অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন শিল্পের বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতা। বিশেষ করে হাওর এলাকা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পর্যটকদের যাতায়াত এখনো চ্যালেঞ্জিং। মধ্যনগর-তাহিরপুর সড়কের অনুপস্থিতি, টাঙ্গুয়ার হাওরের আশপাশে নদী জেটির ঘাটতি, ভুকশিমাইল-হাল্লা নদীপথে দুর্বল নৌচলাচল এসব সমস্যাকে আরও ঘনীভূত করেছে। ছাতক-সুনামগঞ্জ রেলপথ ও কুলাউড়া-ভুকশিমাইল লাইনের অভাবও পরিবহন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে রেখেছে।
সিলেটের রাস্তাঘাটের অবস্থা অনেক স্থানে বেহাল। বিশেষ করে সিলেট থেকে বিছানাকান্দি ও কানাইঘাটের লোভাছড়া যাতায়াতে যোগাযোগ ব্যবস্থা একেবারে নাজুক। যার কারণে অনেকে এসব দর্শনীয় ভ্রমণে অনীহা প্রকাশ করেন।
এছাড়াও আলোচিত পর্যটন স্পটগুলোতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, নিরাপদ পার্কিং ও নিরাপত্তার অভাব রয়েছে। এতে করে বিদেশি ও স্থানীয় পর্যটকরা প্রায়ই বিপাকে পড়েন। বর্ষা মৌসুমে পানিতে ডুবে পর্যটক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। এই বিষয়ে প্রশাসনের তদারকি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপ্রতুল।
সিলেট বিভাগে পর্যটন খাতের উন্নয়নে সরকারের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের অভাবে থমকে আছে পুরো খাত। পর্যটন মহাপরিকল্পনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের পক্ষ থেকে সিলেটের পর্যটন খাতকে বিশ্বমানের করতে ৩৮টি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সুরমা নদীতে ওয়াটার স্পোর্টস ও জেটি স্থাপন, হাকালুকি হাওরে ইকো-কটেজ ও লাক্সারি হাউসবোট নির্মাণ, টাঙ্গুয়ার হাওরে ফ্লোটিং মার্কেট, বারেক টিলায় ভিউ পয়েন্ট, কালচারাল হাট ও পর্যটন অবকাঠামো ইকো বার্ড ইন্টারপ্রেটেশন সেন্টার ও বার্ড হাইড এবং শ্রীমঙ্গলে চা-ভিত্তিক ওয়েলনেস রিসোর্ট স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এছাড়াও পরিকল্পনায় রয়েছে লালটিলা কালী মন্দির ও আদি নীলকণ্ঠ চা কেবিনের পাশে হোমস্টে, মাইগ্রেটরি বার্ড কনজারভেশন সেন্টার, বাইক্কা বিলে বার্ড ওয়াচিং টাওয়ার ও ওয়েটল্যান্ড পার্ক নির্মাণ।
সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মহাপরিকল্পনার ব্যাপারে আমাদের কাছে খুব তথ্য নেই। তবে তারা সিলেটে এসে স্টেক হোল্ডারদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি সভা করেছে। পরে কী হলো তা জানা নেই।
সিলেটের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন হয়নি। তবে গোয়াইনঘাটে একটি পাথরের জাদুঘর তৈরির কাজ চলছে। আগামী বছর এটির কাজ শেষ হবে।
ট্যুরিজম উন্নয়ন বোর্ডের উপ-পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, ৫ বছর আগে এই মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়। ৫ আগস্টের পর কিছু পরিবর্তন করে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পুনরায় খসড়া পাঠানো হয়। এটি অনুমোদন হলে দেশের পর্যটন শিল্পের চেহারা বদলে যাবে।
তিনি বলেন, সিলেটকে চারটি ক্লাস্টারে ভাগ করে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। নতুন কিছু স্পটও অন্তর্ভূক্ত হবে।
সিলেট, পর্যটন শিল্প, অনুন্নত, মহাপরিকল্পনা, ক্লাস্টার, নীতিমালা