১৩ জুন ২০২৬

নির্বাচন / জাতীয় সংসদ নির্বাচন

‘আ.লীগের ঘাঁটি’ খ্যাত সুনামগঞ্জ-২ আসনে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিএনপি-জামায়াত

পাবেল আহমেদ, শাল্লা, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১০:৪৫ পূর্বাহ্ন


রাজনীতির এক উর্বরভূমি হচ্ছে দিরাই-শাল্লা (সুনামগঞ্জ-২)। প্রবাদ আছে ‘রাজনীতি যদি শিখতে চাও, দিরাই-শাল্লা চলে যাও।’ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। 


প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাতবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এই আসন থেকে। তার মৃত্যুর পর স্ত্রী ড. জয়া সেনগুপ্তা নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হন। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে সাবেক এমপি জয়া সেনগুপ্তা আত্নগোপনে চলে যান।

 

দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞার কারণে স্থবির হয়ে পড়া আওয়ামী লীগ কার্যত ভোটের মাঠে অনুপস্থিত। আর এ সুযোগে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী এই আসন নিয়ন্ত্রণে আনতে ভোটের মাঠ গরম করছে বিএনপি ও জামায়াত।


প্রধান উপদেষ্টার ঘোষণা অনুযায়ী, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন যতো ঘনিয়ে আসছে, নির্বাচনের মাঠে উত্তাপ ছড়াচ্ছে। 


সাবেক সংসদ সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরীর উপস্থিতিতে গত ১০ সেপ্টেম্বর দিরাই ও ১৫ সেপ্টেম্বর শাল্লায় বিশাল জনসভা পালন করেছে বিএনপি।  


সুনামগঞ্জ-২ আসনে (দিরাই-শাল্লা) বিএনপির মনোনয়ন পেতে মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন চারজন প্রার্থী। তারা হলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য নাছির উদ্দীন চৌধুরী, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল, সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মিফতা উদ্দিন চৌধুরী রুমি ও যুক্তরাজ্য বিএনপির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আজমল হোসেন চৌধুরী জাবেদ।

 

এদিকে নির্বাচনী মাঠে সরব বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামের মনোনীত প্রার্থী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। নিয়মিত বিভিন্ন প্রোগ্রাম আয়োজন করছেন এই আইনজীবী। সম্প্রতি নৌকাবাইচ আয়োজন করেও দিয়েছেন চমক।

 

এর বাইরেও আসনটিতে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী কেন্দ্রীয় জমিয়তের যুগ্ম মহাসচিব ও যুক্তরাজ্য জমিয়তের সভাপতি ড. মাওলানা শোয়াইব আহমেদ, এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায়।

 

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছিলো নাছির উদ্দীন চৌধুরীকে। অভিযোগ রয়েছে ভোট কারচুপির কারনে ওই নির্বাচনে তিনি জয়লাভ করতে পারেননি। 


এর আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ধানের শীর্ষ প্রতীকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন সাবেক বিচারপতি মিফতা উদ্দিন চৌধুরী রুমি। পরবর্তীতে ওই নির্বাচন ভেঙে যাওয়ায় তত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি থেকে এই এলাকার জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন নাছির উদ্দীন চৌধুরী। 


তবে নাছির চৌধুরী কিছুটা অসুস্থ হওয়ায় ঢাকাতে অবস্থান করছেন। কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশে চিকিৎসায় যাওয়ার কথা রয়েছে। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ফিরে আসলে দিরাই-শাল্লা জনগণ তার প্রতি সাড়া দিবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। 


সম্প্রতি এক জনসভায় তিনি বলেছেন, এই আসনে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সাতবার এমপি হলেও জনগণের মুখে হাসি ফোটাতে পারেননি। এটা তার সর্বশেষ নির্বাচন উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনে জয়লাভ করে অসমাপ্ত কাজগুলো সমাপ্ত করে তিনি জনগণের কাছে দায়মুক্ত হতে চান।

 

অন্যদিকে নিজ এলাকায় অবস্থান করে বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামগঞ্জে জনসংযোগসহ বিভিন্ন প্রোগ্রাম করে করছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক বিচারপতি মিফতা উদ্দিন চৌধুরী রুমি। 


যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দিরাই-শাল্লা কৃষিনির্ভর একটি জনপদ। বিএনপি যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই কৃষকের উন্নয়নে কাজ করেছে। ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়ে এলাকার উন্নয়নকে তরান্বিত করতে হবে।

 

একই সময়ে দিরাই-শাল্লার রাজনীতির মাঠে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৩১ দফা জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া ও জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন অ্যাডভোকেট তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল।


২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি প্রাথমিকভাবে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন। করোনা ভাইরাসের অতিমারির সময় এলাকাবাসীকে ত্রাণ বিতরণসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন তিনি। ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যার সময়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও নিপুন রায়ের উপস্থিতিতে দিরাই ও শাল্লা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ত্রাণ বিতরণ করে এলাকায় অনেক সুনাম কুড়িয়েছেন তিনি।

 

তাহির রায়হান চৌধুরী পাবেল বলেন, বিভিন্ন দুর্যোগময় সময়ে দিরাই-শাল্লার মানুষের পাশে থেকেছি। বিগত সকল আন্দোলন সংগ্রামে নেতাকর্মীদের উদ্বুদ্ধ করেছি। জনগণের কাছে খুব সাড়া পাচ্ছি। দেশ নায়ক তারেক রহমান ও দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেন তাহলে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবো।

 

এদিকে বিগত সময়ে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামে দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজমল হোসেন চৌধুরী জাবেদ। করোনাভাইরাস অতিমারি ও বাইশের বন্যায় এই আসনের মানুষকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে জনগণের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি।


তিনি বলেন, শৈশব থেকেই তিনি জাতীয়তাবাদী আদর্শে উদ্ধুদ্ধ। রাজনীতির সুবাদে তিনি দিরাই-শাল্লার মানুষের কাছাকাছি পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকায় দুই উপজেলার মানুষ তাকে আপন করে নিয়েছে। 


একাধিক প্রার্থী নিয়ে বিএনপির সংকটের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পূর্বঘোষিত একক প্রার্থী হিসেবে অনেক সাড়া জাগিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী ও ছাত্র শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মোহাম্মদ শিশির মনির। 


তিনিও ইতোমধ্যে এই আসনের শতাধিক গ্রামে জনসংযোগের করেছেন। গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের নানাবিধ সমস্যার কথা শুনছেন ও সমাধানের অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। 


তার নিজ অর্থায়নে এই আসনের বিভিন্ন গ্রামে মসজিদ,মন্দিরে নগদ অনুদান, গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, খেলার মাঠ উন্নয়ন,নিজ অর্থায়নে কয়েকটি বাজারে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, বিভিন্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষাবৃত্তি চালু, নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা ও ফুটবল খেলার আয়োজন সহ নানা ধরনের উন্নয়নমুলক কাজের মাধ্যমে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। 


শিশির মনির বলেন, আমি রাজনৈতিক হানাহানি চাই না। মিথ্যা আশ্বাস, অসম্মান চাই না। নির্যাতন চাই না। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই দেশটাকে পরিবর্তন করে দিতে হবে। হাওর-বেষ্টিত এলাকা দিরাই-শাল্লার প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে গ্রামীণ রাস্তাঘাট উন্নয়ন, নদী ও খাল খনন করাসহ ৪৫ হাজার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে শিল্প-কারখানা তৈরি করার ভাবনা জানান তিনি।

 

একই আসনে বাংলাদেশ জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম থেকে ড. মাওলানা শোয়াইব আহমেদকে প্রার্থীতা ঘোষণা করা হলেও রাজনীতির মাঠে তাকে তেমন একটা সরগরম দেখা যায়নি। 


তবে দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার কথা জানিয়ে সরকারের দেওয়া নির্বাচনী শিডিউল মোতাবেক এগিয়ে যাচ্ছি উল্লেখ করে ড. শোয়াইব আহমেদ বলেন, সেই ২০০১ সালের আগে থেকেই দিরাই-শাল্লার জনগণের পাশে রয়েছি। দিরাই-শাল্লায় বিভিন্ন প্রোগ্রাম করেছি। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নানা অর্গানাইজেশনের সাথে কাজ করছি।

 

এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক অনিক রায় জাতীয় গনতান্ত্রিক পার্টি (এনসিপি) থেকে মনোনয়ন পেয়ে এই আসনে নির্বাচন করার আলোচনা থাকলেও এলাকায় এসে জনসংযোগ বা নির্বাচনী কোন প্রোগ্রাম করতে দেখা যায় নি তাকে। 


নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২ লাখ ৮৪ হাজার ৮৯৮ জন ভোটার নিয়ে এই আসনটি গঠিত। এরমধ্যে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৪৭ জন পুরুষ এবং ১ লাখ ৪১ হাজার ২৫১ জন নারী ভোটার রয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

নির্বাচন থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, দিরাই-শাল্লা, সুনামগঞ্জ-২, বিএনপি, জামায়াত, নির্বাচন, রাজনীতি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ