ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ছাতকের ১৭৬ বছরের ঐতিহাসিক ‘ইংলিশ টিলা’
ইতিহাস-ঐতিহ্য
প্রকাশঃ ৩০ আগস্ট, ২০২৬ ১২:১৮ অপরাহ্ন
ছাতকের বাগবাড়ী এলাকায় টিলার ঢালে ঘর তুলে বসবাস করছেন কয়েকটি পরিবার। তাদের মাথার ওপর এখন শুধু বসতবাড়ির ঝুঁকি নয়, রয়েছে ১৭৬ বছরের পুরোনো একটি স্মৃতিস্তম্ভ ধসে পড়ার আশঙ্কাও। টিলার চূড়ায় থাকা ‘সাহেব মিনার’ নামে পরিচিত স্থাপনাটিতে বড় বড় ফাটল ধরেছে। একদিকে হেলে পড়া স্থাপনাটির পলেস্তারা ও নির্মাণসামগ্রী খসে পড়ছে। অন্যদিকে বসতি গড়তে টিলা কাটায় কমছে এর আয়তন। ফলে ঐতিহাসিক স্থাপনাটি যেমন ঝুঁকিতে পড়েছে, তেমনি ঝুঁকিতে রয়েছেন এর আশপাশে বসবাসকারী মানুষও।
সুনামগঞ্জের ছাতক পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাগবাড়ী এলাকায় প্রায় দুই একর ৬০ শতক খাস খতিয়ানভুক্ত জমির ওপর ইংলিশ টিলার অবস্থান। প্রায় ২০০ ফুট উঁচু এই টিলার চূড়ায় রয়েছে ৪০ থেকে ৫০ ফুট উচ্চতার পাকা স্মৃতিস্তম্ভটি। স্থানীয়ভাবে এটি ‘সাহেব মিনার’ নামে পরিচিত।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্মৃতিস্তম্ভটির বিভিন্ন অংশে বড় ফাটল ধরেছে। কোথাও কোথাও পলেস্তারা ও নির্মাণসামগ্রী খসে পড়েছে। পুরো স্থাপনাটি একদিকে হেলে আছে। টিলার বিভিন্ন অংশ কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণ করায় এর স্বাভাবিক আকৃতিও বদলে গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টিলার তিন দিক ঘিরে এখন প্রায় ৫০ থেকে ৬০টি পরিবারের বসতি। বিভিন্ন সময়ে টিলার অংশ কেটে এসব ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে কোথাও কোথাও ধসও নেমেছে। বর্ষায় ভারী বৃষ্টির সময় টিলা ধসে পড়ার আশঙ্কায় বাসিন্দাদের অনেকে উদ্বিগ্ন থাকেন।
বাগবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, ‘দেড় শ বছরের বেশি পুরোনো এই স্থাপনাটি অনেক দিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝখানে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। একদিকে হেলে আছে। যেকোনো সময় ধসে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।’
আরেক বাসিন্দা খায়ের উদ্দীন বলেন, ‘টিলার আশপাশে বিভিন্ন সময়ে স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। টিলা কাটার কারণে এর কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এখানে যারা বসবাস করছেন, তাঁরাও আতঙ্কে থাকেন।’
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ভারী বৃষ্টি কিংবা ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগে হেলে পড়া স্মৃতিস্তম্ভটি ধসে পড়লে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে। গত এক বছরে একাধিকবার ছাতক উপজেলা ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় তাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
স্থানীয় ইতিহাসবিদদের তথ্য অনুযায়ী, ১৭৯৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমন্ত্রণে ইংল্যান্ড থেকে ছাতকে আসেন ব্রিটিশ ব্যবসায়ী জর্জ ইংলিশ। তার হাত ধরে এ অঞ্চলে চুন ও চুনাপাথরের ব্যবসার বিস্তার ঘটে। পরবর্তী সময়ে এই ব্যবসাকে কেন্দ্র করে ছাতক গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে গড়ে ওঠে।
দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ৭৬ বছর বয়সে ১৮৫০ সালে ছাতকেই মারা যান জর্জ ইংলিশ। তার স্মৃতি ধরে রাখতে স্ত্রী হেসরি তাকে ওই টিলায় সমাহিত করেন। একই বছর সমাধির পাশে চারকোণা আকৃতির একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। পরে হেসরি ইংল্যান্ডে ফিরে গেলে জায়গাটি সরকারি খাস জমির অন্তর্ভুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে এটি ‘ইংলিশ টিলা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ছাতকের শিল্পায়নের শুরুর ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত এই স্থাপনাটি তাই শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়; স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। তবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় সেই স্মারক এখন অস্তিত্বের সংকটে।
ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দীন বলেন, ‘ছাতকের ১৭৬ বছরের পুরোনো ইংলিশ টিলা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। এটি কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইংলিশ টিলা, ছাতক, সুনামগঞ্জ, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সাহেব মিনার, টিলা কাটা, ছাতকের ইতিহাস, সংরক্ষণ