জগন্নাথপুরে হারিয়ে যাচ্ছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য বাঁশ শিল্প, মিলছে না ক্রেতা
ইতিহাস-ঐতিহ্য
একসময় অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করলেও বর্তমানে বাঁশ বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিক্রেতাদের
প্রকাশঃ ৮ জুলাই, ২০২৬ ৭:২৭ অপরাহ্ন
ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে দরজায় কড়া নাড়ছে বর্ষা। একসময় এই মৌসুম এলেই সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বাঁশের হাটগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় লেগে থাকত। ঝড়-তুফানে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি মেরামত কিংবা নতুন ঘর নির্মাণের জন্য বাঁশ কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসতেন। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যস্ততা এখন অতীত হয়ে পড়েছে। সারাদিন অপেক্ষা করেও আগের তুলনায় খুব কম বাঁশ বিক্রি করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
উপজেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি বাঁশ সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা। তবে ক্রেতার উপস্থিতি খুবই কম। ফলে আগে দিনে ১০০ থেকে ১৫০টি বাঁশ বিক্রি হলেও এখন ১৫ থেকে ২০টির বেশি বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতেরা।
বিক্রেতা ও বিভিন্ন এলাকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর সহজলভ্যতার কারণে বাঁশের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। একসময় গ্রামীণ ঘরবাড়ি, বেড়া, চালা, মাচা ও বিভিন্ন কৃষিকাজে বাঁশের ব্যাপক ব্যবহার ছিল। বর্তমানে এসব জায়গা দখল করেছে লোহার অ্যাঙ্গেল, কংক্রিটের পিলার, টিন ও প্লাস্টিকজাত সামগ্রী।
জগন্নাথপুর গ্রামের বাঁশ ব্যবসায়ী আনকার মিয়া বলেন, বাঁশের চাহিদা কম এবং দাম একটু বেশি থাকায় মানুষ কিনতে চায় না। একটা বাশের দাম ৩০০-৪০০ টাকা, আবার একটা পাকা পিলারের ৫০০-৬০০ টাকা। পাশাপাশি বাঁশের তুলনায় পাকা পিলারে সময়ও বেশি যায়। ফলে ক্রেতারা সাধারণত বাঁশের বদলে পাকা পিলার কিনে নিয়ে যান।
তিনি বলেন, ‘আগে বৈশাখ মাস আসার আগে থেকেই মানুষ এসে অগ্রিম টাকা দিয়ে বাঁশ বুকিং করে রাখতেন। দিনে ১০০-১৫০ বাঁশ বিক্রি করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আর এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থেকে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বাঁশ বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লাভ তো দূরের কথা, হাটের খাজনা আর পরিবহন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
আরেক ব্যবসায়ী মাসুদ মিয়া বলেন, ‘আগের মতো বাঁশের চাহিদা নেই। বড় কষ্টে আছি। পাকার পিলার বের হয়ে বাশের চাহিদা কমে গেছে।'
শুধু নির্মাণকাজ নয়, বাঁশনির্ভর কুটির শিল্পেও নেমেছে মন্দা। প্লাস্টিক ও অন্যান্য বিকল্প পণ্যের কারণে বাঁশের তৈরি কুলা, ঝুড়ি, ডালা, চালুনি ও চাটাইয়ের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেক পরিবার জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
গন্ধবপুর গ্রামের সুদক্ষিণা সরকার বলেন, ‘আগে ঘরে বাঁশের কলই, ঝুড়ি ও ডালা ব্যবহার করতাম। এখন সব জায়গায় প্লাস্টিকের পণ্য বের হয়েছে। তাই বাঁশের জিনিসের কদর অনেক কমে গেছে।’
একই গ্রামের মনুরঞ্জন সরকার জানান, এখন একটি বাঁশ কিনতে ৪০০ টাকা লাগে। কিন্তু বাঁশ বেশিদিন টেকে না। ৬০০ টাকা দিয়ে কংক্রিটের পিলার কিনলে অনেক বছর ব্যবহার করা যায়। তাই মানুষ সেটাই নিচ্ছে।
জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিপদ দাস বলেন, ‘বাঁশের দাম বেড়েছে, আবার আগের মতো টেকসইও নয়। তাই মানুষ এখন পাকা পিলার দিয়ে ঘর নির্মাণ করছে।’
এদিকে পরিবেশবান্ধব এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের দরকার বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা। তাদের দাবি, বাঁশ চাষে প্রণোদনা, বাজার সম্প্রসারণ এবং বাঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রয়োজন। অন্যথায় জগন্নাথপুরের শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প একসময় ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে বলে শঙ্কা করছেন তারা।
জগন্নাথপুর, বাঁশ শিল্প, ঐতিহ্য, আধুনিকতার ছোঁয়া, গ্রাম-বাংলা