
প্রকৃতি কন্যা সিলেট। কখনও টানা বৃষ্টি, কখনও টানা তাপদাহ। সকালে বৃষ্টি, দুপুরে তীব্র গরম। গত কয়েক বছরে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই অঞ্চলের তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর প্রভাব পড়ছে সিলেটের হাওর, মাটি ও কৃষিতে।
অতিবৃষ্টি, ও উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও বারবার বন্যা ও জলাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় মাটি থেকে ধুয়ে যাচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান। বাড়ছে অম্লতা। মাটির গুণগত মানের এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে সিলেটের কৃষিতেও।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও বন্যার প্রকোপ বৃদ্ধির সঙ্গে মাটির গুণগত মানের বেশ পরিবর্তন ঘটছে। যার কারণে কৃষিখাতে পরিবর্তন ঘটছে। একসময় যে জমিতে সাইট্রাস জাতীয় ফল উৎপাদন হতো, এখন সেখানে ভিন্ন ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
গবেষকরা বলছেন, সিলেট অঞ্চলের ৯২ শতাংশ মাটি অম্লীয় (অ্যাসিডিক)। তার মধ্যে ২৬ শতাংশ অতিমাত্রায় অম্লীয়। সিলেট অঞ্চলের ২৬ শতাংশ মাটির পিএইচ মাত্রা ৪.৫ এর নিচে। আর ৬৬ শতাংশ মাটির পিএইচের মাত্রা ৪.৫ থেকে ৫.৫। বাকি মাত্র ৮ শতাংশ মাটির পিএইচ ৫.৬ থেকে ৬.৫।
সিলেটের মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইন্সটিউটের ২০০৫ ও ২০২৬ সালের একই উপজেলার মাটি নিয়ে দুইটি গবেষণা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সিলেটের মাটির অম্লতা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে মাটিতে জৈব পদার্থ, নাট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ক্যালসিয়াম ও গন্ধকসহ বিভিন্ন উপাদান কমছে। ওই উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণির মাটির পরীক্ষা করে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মৃত্তিকা দল।
মৃত্তিকা দলের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে বড়লেখা উপজেলায় মাটির পিএইচ ছিল ৪ দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ৭। ২০২৬ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৯ থেকে ৫ মাত্রায়। এছাড়াও ২০০৯ সালে বিয়ানীবাজার উপজেলায় মাটির পিএইচ ছিল ৪ দশমিক ৫, বিজিপুরে উচু জমিতে ৪ দশমিক ২ ও মাঝারি উচু জমিতে ৪ দশমিক ৫, প্রিতিম পাশা উঁচু জমিতে ৪ দশমিক ৭ ও নিচু জমিতে ৪ দশমিক ১ থেকে ৪ দশমিক ৪, মনু এলাকার মাঝারি নিচু জমিতে মাটির পিএইচ ৪ দশমিক ৯ ও নিচু জমিতে ছিল ৪ দশমিক ৫ থেকে ৪ দশমিক ৮।
২০২৬ সালে একই উপজেলার মাটি গবেষণা করে দেখা গেছে, মাটির পিএইচ আরও কমেছে। অর্থাৎ অম্লতা বেড়েছে। কোনো কোনো স্থানে অত্যাধিক অম্ল মাটিও পেয়েছে গবেষণা দল।
এ বছরের গবেষণায় দেখা গেছে বড়লেখা উপজেলায় মাটির পিএইচ ২ দশমিক ৯ থেকে ৫, বিয়ানীবাজার উপজেলায় ৪ দশমিক ২, বিজিপুরে উচু জমিতে ৪ ও মাঝারি উচু জমিতে ৪ দশমিক ২ থেকে ৪ দশমিক ৩, প্রিতিম পাশা উঁচু জমিতে ৪ দশমিক ৩ ও মাঝারি নিচু জমিতে ৪ দশমিক ২ এবং মনু এলাকার মাঝারি নিচু জমিতে মাটির পিএইচ ৩ দশমিক ৮ ও নিচু জমিতে রয়েছে ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৩।
অন্যদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উচ্চ তাপমাত্রা ও অতিবৃষ্টির কারণে মাটি থেকে জৈব পদার্থ দ্রুত ক্ষয় এবং পুষ্টিগুণ কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে মাটির নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, গন্ধক, দস্তা, বোরণ, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, তামা, লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ ক্রমেই কমছে।
গবেষকরা বলছেন, অতিবৃষ্টি হলে নাইট্রোজেন সহজেই মাটি থেকে ধুয়ে যায়। সিলেটে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই ক্ষয় আরও ত্বরান্বিত হতে পারে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইসস্টিটিউট সিলেটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সিলেটে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের স্রোতে মাটির উপাদন ক্ষয় হচ্ছে। মাটির ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামসহ বিভিন্ন উপাদান ব্যাপক হারে কমছে। এতে মাটির গুণগত মান নষ্ট হওয়ায় চাষাবাদে পরিবর্তন ঘটছে।
তিনি বলেন, একদিকে মাটির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। অন্যদিকে কেৃষকরা না বুঝে মাটিতে সবচেয়ে বেশি ইউরিয়া সার ব্যবহার করছেন। ইউরিয়া ব্যবহারের কারণে মাটির এসিডিটি বাড়ছে।
কামাল হোসেন বলেন, মাটিতে পিএইচ-এর মাত্রা ৭ এর কম হলে তাকে অ্যাসিডিক বলে। সিলেটের প্রায় ৮০ শতাংশ মাটির পিএইচ মাত্রা ৪.৫ থেকে ৫.৫ এর মধ্যে। কম পিএইচ মাত্রার মাটি সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফলের জন্য উপযুক্ত।
গবেষক কামাল হোসেন আরও বলেন, সিলেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা হাওর। যা বছরের অধিকাংশ সময় পানির নিচে থাকে। ধানের ক্ষেত্রে কম পিএইচ বা অ্যাসিডিক মাটি কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে না। তবে এটি ফল ও সবজি উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা। সিলেটে প্রাকৃতিকভাবে আম গাছ হলেও বাণিজ্যিকভাবে আম চাষে সফল হওয়া কঠিন। কারণ এখানে আম উৎপাদনের জন্য মাটি উপযুক্ত না।
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনেয়ারুল ইসলাম বলেন, উত্তরপূর্বাঞ্চলের জেলা সিলেটে বৃষ্টিপাতের কারণ হলো উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু। এই বায়ু বঙ্গপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে জলীয় বাষ্প বহন করে নিয়ে আসে। মেঘালয় পাদদেশে ঘনীভবন ঘটিয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
তিনি বলেন, মৌসুমি বায়ু কত আগে আসবে সেটা নির্ভর করে সমুদ্রপৃষ্টের উষ্ণতার উপর। সমুদ্রপৃষ্ট মার্চ এপ্রিল মাসে প্রচুর সুর্যালোক গ্রহণ করে বিপুল পরিমাণে জলীয় বাষ্প দেয়। সেই জলীয় বাষ্প বাতাসে নিয়ে এসে আমাদের এখানে বৃষ্টিপাত ঘটাচ্ছে। মৌসুমি বায়ু আগে ভাগে চলে আসায় সিলেটে আগাম বৃষ্টিপাত হচ্ছে।
শেয়ার করুনঃ
কৃষি থেকে আরো পড়ুন
সিলেট, জলবায়ু, বৃষ্টি, অম্লত্ব, পুষ্টি, অতিবৃষ্টি, ফসল


