১৪৭৩ বিদ্যালয়ের অধিকাংশই দুর্গম
বর্ষা এলেই নৌকায় ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলযাত্রা, নিরাপত্তাহীন হাওরের শিশুরা
তথ্যপ্রযুক্তি-শিক্ষা
প্রকাশঃ ৩ আগস্ট, ২০২৬ ৬:০৯ অপরাহ্ন
বর্ষা এলেই দুর্ভোগের চিত্র বদলে যায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। জেলার অধিকাংশ এলাকা যোগাযোগবিহীন ও দুর্গম হওয়ায় প্রতিবছর এই সময় বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয় খুদে শিক্ষার্থীদের। সময়ের সঙ্গে দেশের নানা খাতে উন্নতি ঘটলেও হাওরের শিক্ষাব্যবস্থায় নিরাপত্তার অভাব রয়েই গেছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ পুষে রেখেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
গত সপ্তাহের সুনামগঞ্জের দুর্গম হাওরাঞ্চলের কয়েকটি বিদ্যালয়ে সরেজমিনে যান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। পরিদর্শনকালে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শিখনজনিত ঘাটতি কাটাতে মৌলিক বিষয়ে পাঠদান জোরদারের ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম আরও কার্যকর করার আশ্বাস দেন প্রতিমন্ত্রী।
এলাকার শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যমতে, বর্ষায় হাওরের সবকিছু পানির নিচে চলে গেলে গোটা অঞ্চল হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ নৌকানির্ভর। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো রূপ নেয় প্রতিটি গ্রাম। বড়রা প্রয়োজনমতো নৌকায় চলাফেরা করতে পারলেও আবহাওয়া প্রতিকূল হলে সবচেয়ে বিপদে পড়ে ছোট শিক্ষার্থীরা। ঝড়, বৃষ্টি, আফাল, বজ্রপাত এমনকি নৌকাডুবির শঙ্কা মাথায় নিয়েই হাওর-নদী পেরিয়ে বিদ্যালয়মুখী হতে হয় তাদের। ফলস্বরূপ শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ, পাঠে ঘাটতি এবং ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে নিরাপদ নৌযান নিশ্চিতসহ কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট সংখ্যা ১ হাজার ৪৭৩টি, যার মধ্যে সদর উপজেলায় ১২৯, দোয়ারাবাজারে ১০৪, বিশ্বম্ভরপুরে ৭৮, ছাতকে ১৮৫, তাহিরপুরে ১৩৪, জামালগঞ্জে ১২৬, ধর্মপাশায় ১১০, শাল্লায় ১০৫, দিরাইয়ে ১৬৩, জগন্নাথপুরে ১৫৮, শান্তিগঞ্জে ৯৭ এবং মধ্যনগরে ৮৪টি। এসবের সিংহভাগই অবস্থিত দুর্গম এলাকায়।
শাল্লা উপজেলার বাহাড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভেড়াডহর হাওরে গড়ে উঠেছে মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মির্জাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রথমটিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৭৬ ও দ্বিতীয়টিতে ৯৪ জন। হাওরের মাঝ বরাবর কয়েকটি পাড়া জুড়ে গড়ে উঠেছে মির্জাপুর গ্রাম, যা উপজেলা সদর থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই গ্রামের বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর পরিবার দরিদ্র ও শিক্ষা বিষয়ে খুব একটা সচেতন নয়। শিশুরা নিজেরাই নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে। স্থানীয় শিক্ষক ও বাসিন্দাদের মতে, ঝড়-বৃষ্টির দিনে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
বিদ্যালয় সংলগ্ন নতুন হাটি এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমানের তিন সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে আইজুল পড়ছে প্রথম শ্রেণিতে। একমাত্র মেয়ে রিয়া মনির পড়ালেখা থেমে গেছে চতুর্থ শ্রেণিতে এসে। বড় ছেলে কোনোমতে প্রাথমিক ধাপ পার করলেও নানা পারিবারিক বাধ্যবাধকতায় আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি। বাড়ির কাছের প্রায় তিনশ ফুট রাস্তায় মাটি ভরাটের দাবি জানিয়ে সাইদুর রহমান বলেন, কেউ পানি ভাইঙ্গা যায়। কেউ নৌকা দিয়া। স্কুলে আসা-যাওয়ার একটা নৌকা দিলে খুব ভালো হয়।
মির্জাকান্দা নতুন হাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক চমক কান্তি তালুকদার বলেন, আমরা এক্কেবারে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। চারপাশে শুধু পানি। ছাত্রছাত্রীরা নৌকা বেয়েই স্কুলে আসে। আবহাওয়া খারাপ থাকলে ছাত্ররা তেমন আসে না।
তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরের তীরে অবস্থিত লামাগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৪২ জন। বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নাসরিন আক্তার জানান, আবহাওয়া খারাপ থাকলে অনেক ছাত্রছাত্রী স্কুলে আসে না। সমস্যার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, ছাত্রছাত্রী নিজেরা নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়ে অনেকটা ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। ঝড়-বৃষ্টিসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখী হতে হয় তাদের। সরকারিভাবে নৌকার ব্যবস্থা করতে পারলে ঝুঁকি এড়ানো অনেকটা সম্ভব।
একই বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থী মো. আরিফ ও ইসরাত জাহান নোহা জানায়, নৌকা বেয়ে ও সাঁকো পার হয়েই তাদের প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয়। নিজস্ব নৌকা না থাকায় অনেকে আবহাওয়া খারাপ থাকলে আসতেই পারে না। বৃষ্টিতে বই-খাতা ও পোশাক ভিজে গেলেও ভেজা অবস্থাতেই ক্লাস করতে হয় বলে জানায় তারা।
রংচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র চন্দ্র সরকারের বলেন, শিশু ছাত্রছাত্রীরা হরহামেশাই ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। তাদের স্কুলে যাতায়াতের মাধ্যম একমাত্র নৌকা। হাওরপাড়ের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজন সরকারি বিশেষ উদ্যোগ।
সুনামগঞ্জ পৌর কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, প্রকৃতিনির্ভর জীবন-জীবিকা বাদ দিলে সামনে চলে আসে হাওরের দুর্যোগপূর্ণ শিক্ষা পরিস্থিতি। নৌকাডুবি, ঝড়-ঝাপ্টা ও বজ্রপাতের আশঙ্কার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি আরও যোগ করেন, ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিতে বর্ষা মৌসুমের মাসছয়েক বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি নিরাপদ নৌযানের ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে দিন দিন শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে শিক্ষার্থীরা।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস বলেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মহোদয় তাহিরপুরের চারটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করেছেন। হাওর এলাকার শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা উনাকে বলা হয়েছে। বর্ষাকালে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াতের বিষয়টি তিনি অবহিত হয়েছেন। আশা করি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
হাওরের শিক্ষা, প্রাথমিক বিদ্যালয়, নৌকা, ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলযাত্রা, শিক্ষার্থী নিরাপত্তা, গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী