লেবু-কমলার দেশে আম-কাঁঠালের ফলন সবার শীর্ষে, বাণিজ্য তবুও ঢাকামুখী
ব্যবসা-বাণিজ্য
প্রকাশঃ ২৯ জুন, ২০২৬ ১২:৪৩ অপরাহ্ন
সিলেট অঞ্চলের ৯২ শতাংশ মাটি অম্লীয়। এর মধ্যে ২৬ শতাংশ আবার অতিমাত্রায় অম্লীয়। এ ধরনের মাটি মূলত লেবু, কমলা ও মাল্টার মতো সাইট্রাস জাতীয় ফল উৎপাদনের জন্য উপযোগী বলে প্রচলিত ধারণা। কিন্তু বাস্তবতা এখন ভিন্ন। সিলেট বিভাগে ফল চাষে এখন সবার শীর্ষে আম ও কাঁঠাল। তবে বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও এই দুই ফল সিলেটের অর্থনীতিতে বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। বাণিজ্যিক চাষ না হওয়ায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের আম-কাঁঠালের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে সিলেটবাসীকে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং ফলভিত্তিক বাগান সম্প্রসারণ প্রকল্পের কারণে সিলেটে ফল চাষে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আগে যেসব জমিতে কেবল লেবু বা ঐতিহ্যবাহী ফসল চাষ হতো, এখন সেখানে মিশ্র ফলবাগান গড়ে উঠছে। অনেক কৃষক চা-বাগানের আশপাশের টিলাভূমিতেও আম, কাঁঠাল ও আনারসের আবাদ করছেন।
সিলেটের খাদিমনগর হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, অ্যাসিডিক মাটির কারণে সিলেটে লেবু, কমলা এবং মাল্টা খুব ভালো জন্মে। আম, কাঁঠাল বা তরমুজ এই মাটিতে চাষ করা সম্ভব হলেও মাটিকে আগে চুন প্রয়োগ করে নিরপেক্ষ করে নিতে হয়। মাটিকে নিরপেক্ষ না করলে গাছ বড় হলেও ফলন আশানুরূপ হয় না।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও কুয়াশার কারণে রোগবালাই এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ বেশি হয়, যা আমসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি করে। তিনি বলেন, ❝বাসাবাড়ির আশেপাশে আম গাছ বেশি দেখা যাওয়ার কারণ হলো আমের মূল মাটির অনেক গভীরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারে। তবে পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং ফল ঝরে যাওয়ার হার বেশি হওয়ায় কেউ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করে না।❞
সিলেট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আম, কাঁঠাল বা অন্যান্য ফলের বাণিজ্যিক চাষে মাটির পিএইচ, জৈব পদার্থের পরিমাণ এবং সুষম সার ব্যবস্থাপনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতে হয়। আধুনিক বাগান ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই দমন এবং উন্নত জাত নির্বাচন ছাড়া কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের চার জেলায় অন্তত ৫১ ধরনের ফল উৎপাদন হয়। মৌলভীবাজারে সবচেয়ে বেশি ফল উৎপাদন হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ জেলায় ২ হাজার ২৩৯ হেক্টর জমিতে আম চাষ করে ২৮ হাজার ৮১৫ মেট্রিক টন এবং ২ হাজার ১২১ হেক্টরে কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে।
সিলেট জেলায় উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে তরমুজ। ৬৬৪ হেক্টর জমিতে ২৭ হাজার ৮৮৮ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদন হয়েছে। হবিগঞ্জে সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল উৎপাদন হয়েছে ৯৬০ হেক্টর জমিতে ১৩ হাজার ৫৫ মেট্রিক টন। হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জেও তরমুজের আবাদ সবার শীর্ষে ৫৭৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৭৫৫ মেট্রিক টন।
এত বিপুল উৎপাদন সত্ত্বেও সিলেটের কোনো ফলই বিদেশে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। ব্যতিক্রম কেবল জারা লেবু তবে সেটিও সিলেট থেকে সরাসরি নয়, ঢাকার ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে রপ্তানি হচ্ছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে 'ওয়্যারহাউজ প্যাকেজিং ব্যবস্থা' না থাকায় ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
সিলেটের ফল আমদানি-রপ্তানিকারক মো. আবুল কালাম বলেন, একসময় সিলেট থেকে সাতকরা ও জারা লেবু লন্ডনে রপ্তানি হতো। এখন শুধু জারা লেবুই রপ্তানি হয়, তাও ঢাকার ব্যবসায়ীরা বেশি করেন। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে ওয়্যারহাউজ প্যাকেজিং ব্যবস্থা না থাকায় রপ্তানিকারকরা ঢাকার মাধ্যমে ফল পাঠান।
ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক মো. হাফিজ আহমদ বলেন, ওয়্যারহাউজ প্যাকেজিং ব্যবস্থা ছাড়া সব সুযোগ-সুবিধা এখানে রয়েছে। এই ব্যবস্থা শুধু ঢাকায় আছে। তবে ইউরোপ ও আমেরিকা ছাড়া অন্যান্য দেশে রপ্তানি করতে চাইলে সিলেট থেকেই পাঠানো সম্ভব।
সিলেট, ফল, ব্যাবসা, বাণিজ্য, লেবু, কমলা, আম-কাঁঠাল