
সাদাপাথর লুটপাটকে কেন্দ্র করে সিলেট যখন দেজুড়ে আলোচনার তুঙ্গে ছিল, ঠিক তখনই র্যাবের আলোচিত ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচিত মো. সারওয়ার আলম সিলেটের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদান করেন। তার এই আগমনটা ছিল বেশ আলোচিত।
দাপুটের সঙ্গে সিলেটের বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে বেশ প্রশংসা কুঁড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয়ের হিসাবে ‘জোরপূর্বক’ হস্তক্ষেপ করে বিতর্ক সৃষ্টি করে এবার সমালোচিত হয়েই বিদায় নিতে হচ্ছে তাকে।
রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে সিলেটের ডেপুটি কমিশনারের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে ন্যস্ত করা হয়। যদিও প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে এ ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মূলত হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজারের দানবাক্স এবং ঐতিহাসিক ডেগের নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়েই তিনি ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেন। সেই বিতর্কের রেশ কাটতে না কাটতেই বদলির আদেশ আসে। ফলে সিলেটে তাঁর বিদায়ও হচ্ছে আলোচনার মধ্য দিয়ে।
সারওয়ার আলম সিলেটে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রশাসনিক নানা উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন। নগরী থেকে ফুটপাট উচ্ছেদ, অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধ ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, সরকারি সম্পদ উদ্ধার ও প্রশাসনিক তৎপরতার কারণে তিনি বেশ কয়েকবার আলোচনায় আসেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় সিলেটের দুই ঐতিহাসিক মাজারের দানবাক্স ও ডেগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের পদক্ষেপ।
সিলেটের আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের কেন্দ্র হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) মাজার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাজার দুটিতে ভক্তদের দান, মানত ও নজরানা সংগ্রহ হয়ে আসছে। এসব অর্থ ও সম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে জেলা প্রশাসন সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, দান ও সম্পদের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সরকারি তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরপরই ধর্মীয় সংগঠন, আলেম-উলামা, খাদেম সমাজ এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের পক্ষ থেকে আপত্তি ওঠে।
সিলেটের বিশিষ্টজনরা বলছেন, দুই মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এই দুই মাজারের সঙ্গে সিলেটের মানুষের আবেগ-অনুভূতি জড়িত। সিলেটবাসীকে সঙ্গে নিয়ে মাজারের আয়-ব্যয়ে হস্তক্ষেপ করলে এটি আরও কার্যকর হতো। কিন্তু তিনি খুব কম সময়ে জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করে আলোচনায় চলে এসেছেন।
সারওয়ার আলমের সিলেটে আগমনও কম আলোচিত ছিল না। এর আগে তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান। গেল বছরের ১৮ আগস্ট সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁকে ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও ছিল বেশি। তাঁর নিয়োগকে তখন প্রশাসনে কঠোরতা ও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন অনেকে।
তবে দায়িত্ব পালনের পুরো সময়জুড়ে তিনি প্রশংসা ও সমালোচনা দুই ধরনের প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হয়েছেন। প্রশাসনের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন, কিছু বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন ইস্যুতে অবস্থানের কারণে তাঁকে নিয়ে আলোচনা কখনো থামেনি।
শাহজালাল (রহ.) মাজারে নিয়মিত নামাজ আদায় করা লোকমান মিয়া বলেন, এই মুহুর্তে প্রশাসককে সরানো ঠিক হয় নাই। যারা এসব করিয়েছে দুনিয়াতে এদের বিচার হবে আখেরাতে বিচার হবে ইনশাল্লাহ। কোনো বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পরপরই কাউকে সরিয়ে দেওয়া সব সময় সঠিক সমাধান নয়।
তিনি বলেন, যদি প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন থাকে, তাহলে তার সুষ্ঠু তদন্ত ও মূল্যায়ন হওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে এক মাস, দুই মাস বা নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। আবার যদি বদলিই দিতে হয়, তাহলে সেটিও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে করা উচিত, যাতে কোনো ভুল বার্তা না যায়।
তিনি আরও বলেন, দুঃখজনকভাবে আমরা এখন এমন এক সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গেছি, যেখানে একটি ইস্যু শেষ হওয়ার আগেই আরেকটি ইস্যু সামনে চলে আসে। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রায়ই একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ ও কাদা ছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত থাকে। সংসদে জনগণের সমস্যা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় সেখানে পারস্পরিক দোষারোপই বেশি দেখা যায়।
শাহাজালালের মাজারে আসা দর্শনার্থী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র রুমান আহমদ, তিনি আলোচিত কাণ্ডে সিলেট এসেছিলেন আবার নিজেই আলোচিত ঘটনার জন্ম দিয়ে বিদায় নিলেন। তবে উনার এমন বিদায় আমরা প্রত্যাশা করিনি।
পরিবেশকর্মী শাহ শিকান্দার আহমেদ শাকির বলেন, দেশের বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কিশোরগঞ্জের পাগলা মসজিদের দানবাক্স খোলার সময় গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে প্রকাশ্যে অর্থ গণনা করা হয় এবং সেই হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়। ফলে সেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি চর্চা তৈরি হয়েছে। কিন্তু সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারসহ অন্যান্য অনেক মাজারের দানবাক্সের হিসাব-নিকাশ সাধারণ মানুষের সামনে সেভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। তাই আয়-ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য যদি জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
তিনি বলেন, তবে একই সময়ে আরেকটি বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। মাজারের দানবাক্স ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগের মধ্যেই জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম নিয়েছে। যেহেতু একটি উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তাই অন্তত কিছু সময় সেটির ফলাফল দেখার সুযোগ দেওয়া যেত। এক মাস বা নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিলে হয়তো অনেক প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যেত।
শেয়ার করুনঃ
রাজনীতি থেকে আরো পড়ুন
সারওয়ার আলম, ম্যাজিস্ট্রেট, বদলি, মাজার, সিলেট জেলা প্রশাসন, বিতর্ক


