সেন্টিনেল উপগ্রহের চোখে সুরমা: বর্ষাকালে নদীতে দূষণ বেড়ে যায় কয়েক গুণ
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ৬ জুন, ২০২৬ ১২:৩০ অপরাহ্ন
সিলেটের প্রাণ হিসেবে পরিচিত সুরমা নদী এখন ক্রমেই হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক জলজ পরিবেশ। বন্যা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্প ও গৃহস্থালি বর্জ্য, নদীতীর দখল এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে নদীর পানি দিন দিন দূষিত হয়ে উঠছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই দূষণ ভয়াবহ আকার নেয়। আন্তর্জাতিক একটি গবেষণায় উপগ্রহের তথ্য ও মাঠ নমুনা বিশ্লেষণ করে এই উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, বর্ষাকালে সুরমা নদীতে দূষণের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা শুধু জলজ প্রাণী নয়, নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও জীবিকার জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
গবেষণায় সরাসরি মাঠে গিয়ে শুধু কয়েকটি স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়নি, বরং মহাকাশ থেকে সেন্টিনেল-২ এবং সেন্টিনেল-১ উপগ্রহ পাঠানো ছবি বিশ্লেষণ করে সুরমা নদীর ব্যাপক এলাকাজুড়ে পানির মানের পরিবর্তন ধরা হয়েছে। ‘সেন্টিনেল’ ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার এক জোড়া উপগ্রহ, যা নিয়মিত বিশ্বের বিভিন্ন নদী, জলাশয় ও ভূপৃষ্ঠের ছবি তুলে বিনামূল্যে তথ্য দেয়। এই উপগ্রহগুলোর স্পেশাল সেন্সর (মাল্টিস্পেকট্রাল ইমেজার) পানির ভেতরের ক্ষুদ্র কণা, দ্রবীভূত পদার্থ ও স্থগিত ময়লা শনাক্ত করতে পারে, যা খালি চোখে দেখা যায় না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ডিসকভার এনভায়রনমেন্ট’-এ প্রকাশিত গবেষণায় সিলেট নগরীর বন্যাপ্রবণ এলাকায় পানি দূষণের চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণাটি করেছেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদের গবেষক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন হৃদয়, পুস্পেন্দু বিশ্বাস পাল এবং চীনের সাউথওয়েস্ট জিয়াওটং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আন্দলিব মাসুদ। তাঁরা আধুনিক স্যাটেলাইটভিত্তিক রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে সুরমা নদীর পানির গুণগত মান, মৌসুমি পরিবর্তন এবং বন্যার প্রভাব বিশ্লেষণ করেছেন।
উপগ্রহের তথ্য আরও দেখিয়েছে, সুরমা নদীতে দূষণের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শিল্পকারখানার বর্জ্য, গৃহস্থালি নোংরা পানি, কৃষিজমি থেকে আসা রাসায়নিক ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ। বর্ষাকালে বন্যার পানি এসব দূষিত উপাদান নদীতে ছড়িয়ে দেয়। এতে পানির ভেতরে স্থগিত কঠিন পদার্থ, দ্রবীভূত লবণ ও দূষণসূচকের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।
গবেষকেরা ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তিন মৌসুমে বর্ষা, শীত ও গ্রীষ্মে সুরমা নদীর তিনটি স্থানে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালান। নমুনা সংগ্রহ করা হয় ইউনিপেক্স এলাকা, কাজিরবাজার ও কানাইঘাট থেকে। মোট ২৭টি পানির নমুনা বিশ্লেষণ করে নদীর পানিতে মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থ (টিডিএস), বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (ইসি) এবং মোট স্থগিত কঠিন পদার্থের (টিএসএস) মাত্রা নির্ণয় করা হয়।
উপগ্রহের তথ্যের ফলাফলে দেখা যায়, বর্ষাকালে সুরমার নদীর পানিতে টিএসএসের গড় মাত্রা ছিল ৪৯৪ দশমিক ২২ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার। অথচ গ্রীষ্মে তা ছিল ২০৬ দশমিক ৪৫ এবং শীতে ১৯৮ দশমিক ৫০ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার। অর্থাৎ বর্ষায় নদীতে স্থগিত কঠিন বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণের বেশি বৃদ্ধি পায়। গবেষকদের মতে, ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল, নদীতীর ভাঙন ও নগরের বর্জ্য নদীতে প্রবেশ করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বর্ষার সময় পানির প্রবাহ ও স্রোতের গতি বেড়ে যাওয়ায় নদীর তলদেশের পলি, আবর্জনা ও দূষিত পদার্থ ওপরে উঠে আসে। ফলে পানির স্বচ্ছতা কমে যায় এবং জলজ প্রাণীর জন্য ক্ষতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। একই সঙ্গে কৃষিজমি থেকে বৃষ্টির পানির সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকও নদীতে এসে মিশে।

সেখানে আরও বলা হয়, সিলেটে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ৬ হাজার ৪৬৭ হেক্টর এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় ৩ লাখ ৯১ হাজার মানুষ। একই সঙ্গে প্রায় ১০ হাজার ৭০২ হেক্টর নগর এলাকা পানির নিচে চলে যায়। গবেষকদের মতে, বন্যা শুধু মানুষের ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর ক্ষতি করেনি, বরং নদীর পানিদূষণকেও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, বন্যার পানি শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা, ভারী ধাতু ও বিভিন্ন দূষিত উপাদান নদীতে ছড়িয়ে দেয়। এর ফলে নদীর পানির রাসায়নিক গুণাগুণ বদলে যায় এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে নদীর পানি ব্যবহারকারী নিম্নআয়ের মানুষ ও জেলেদের ঝুঁকি বেশি।
গবেষণায় আধুনিক স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ‘সেন্টিনেল-২’ ব্যবহার করে পানির গুণগত মান পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা বলছেন, প্রচলিত পদ্ধতিতে পানি পরীক্ষা করতে সময় ও অর্থ বেশি লাগে। কিন্তু স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করলে স্বল্প সময়ে বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। এতে দূষণের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা দ্রুত শনাক্ত করা এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মতো দেশে পরিবেশ পর্যবেক্ষণে রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। কারণ অনেক এলাকায় নিয়মিত পরীক্ষাগারভিত্তিক পানি পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। স্যাটেলাইট তথ্য ব্যবহার করে কম খরচে নদীর দূষণ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা গেলে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী হবে।
গবেষনায় অংশ নেয়া সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য অনুষদের শিক্ষার্থী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন হৃদয় বলেন, ‘সেন্টিনেল উপগ্রহ আমাদের সুরমার ওপর নজর রাখার এক অসাধারণ সুযোগ করে দিয়েছে। আমরা যদি নিয়মিত এই উপগ্রহের তথ্য ব্যবহার করি, তাহলে বন্যার আগেই দূষণের প্রবণতা বুঝতে পারব এবং ব্যবস্থা নিতে পারব। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ ধরনের উদ্যোগ নেই। ফলাফল হিসেবে বর্ষা এলেই সুরমার মাছের বাসস্থান বিষাক্ত হয়ে ওঠে, যা মৎস্যজীবী ও সাধারণ মানুষের জন্য বড় হুমকি। কারণ সিলেট অঞ্চলে নদী কেন্দ্রিক ৭ থেকে ৮ লক্ষ পরিবারের বসবাস’
তবে তিনি সর্তক করে বলেন, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধন নিশ্চিত করা, নদীতীর দখলমুক্ত রাখা এবং উন্নত ড্রেনেজব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী এলাকায় সবুজ বেষ্টনী তৈরি, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি ব্যবস্থা চালুর সুপারিশও করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম বলেন, ছড়া, খাল ও নদী দূষণ রোধে দেশে বিদ্যমান আইন যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও এর কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩ অনুযায়ী নদী রক্ষা, নদী দখল ও দূষণ প্রতিরোধে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দায়িত্ব ও ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০-এর মাধ্যমে পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধের বিচার করার জন্য পরিবেশ আদালত ও পরিবেশ আপিল আদালত গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ধারা ৭ অনুযায়ী পরিবেশের ক্ষতি, দূষণ বা পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ কার্যক্রম বন্ধে সরকার প্রয়োজনীয় প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। এছাড়া একই আইনের ধারা ১৫-এ পরিবেশ দূষণজনিত অপরাধের শাস্তির বিধান রয়েছে। এ ধারায় আইন লঙ্ঘনের দায়ে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। পুনরায় একই অপরাধ করলে শাস্তি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিনি বলেন, নদী, ছড়া, খাল বা জলাধারে শিল্পবর্জ্য, পলিথিন, রাসায়নিক কিংবা অন্যান্য ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলে দূষণ করা সরাসরি পরিবেশবিরোধী অপরাধ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট অনেক সংস্থার মধ্যে এসব আইন প্রয়োগে অনীহা লক্ষ্য করা যায়। আমরা মনে করি, বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করলেই নদী দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। তবে সিটি কর্পোরেশন এলাকার ছড়া-খাল ও নদী দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন আরও কঠোর ও সময়োপযোগী করা প্রয়োজন।
সিলেট, সুরমা নদী, গবেষণা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সেন্টিনেল উপগ্রহ