নিষেধাজ্ঞা, মামলা, অভিযানের পরও ঠেকানো যাচ্ছে না সিলেটের পাথর লুট
অপরাধ-বিচার
প্রকাশঃ ২ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৫ অপরাহ্ন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। পিয়াইন নদীর বুক চিরে ছোট্ট একটি নৌকা ভিড়ল বিছনাকান্দির তীরে। নৌকা থেকে নেমেই দুই ব্যক্তি কোমরসমান পানিতে নেমে নদীর তলদেশ থেকে পাথর তুলতে শুরু করলেন। যেন সময়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতা। এদিকে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই নৌকা ভর্তি এসব পাথর স্থানীয় বাজারে পৌছাঁবে। পরে সেখান থেকে ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিবহন হবে এসব লুটকৃত পাথর।
এ দৃশ্য এখন শুধু বিছনাকান্দির নয়। সিলেটের যেসব এলাকায় এখনো পাথর ও বালুর মজুত রয়েছে, সেসব এলাকাজুড়েই একই চিত্র। রাতের আঁধার থেকে ভোর পর্যন্ত চলে অবৈধ উত্তোলন। প্রশাসন, পুলিশ ও বিজিবির নজর এড়িয়ে কিংবা স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় সংঘবদ্ধ চক্র নির্বিঘ্নে চালিয়ে যাচ্ছে এই কর্মকাণ্ড। পরিবেশবিদরা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে চলা এই অবৈধ উত্তোলন সিলেটের নদী, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য এবং পর্যটন সম্ভাবনাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
সম্প্রতি গোয়াইনঘাটের বিছনাকান্দি ও জাফলং, কোম্পানীগঞ্জের সাদা পাথর, শাহ আরেফিন টিলা, উৎমাছড়া ও রেলওয়ে বাংকার এলাকা, কানাইঘাটের লোভাছড়া এবং জৈন্তাপুরের শ্রীপুর, রাংপানি ও বড়গাং এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই পাথর ও বালু উত্তোলন চলছে। নদী থেকে সংগ্রহ করা পাথর নৌকায় এনে তীরে স্তূপ করা হচ্ছে, পরে ট্রাকে করে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।
সিলেটের আটটি পাথর কোয়ারি দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে হস্তচালিত পদ্ধতিতে ইজারা দেওয়া হলেও পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে ২০১৫ সালে জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষণা করা হয়। এর আগে ২০১৪ সালে হাইকোর্ট আটটি কোয়ারিতেই যান্ত্রিকভাবে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেন। পরে ২০২০ সালে সরকার সব কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে।
কিন্তু নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও অবৈধ উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ওই সময়ের কয়েক দিনের মধ্যেই শুধু জাফলং এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কোটি টাকার পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়। ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর পর্যটন এলাকাও অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় পাথরশূন্য হয়ে পড়ে।
পরিবেশবাদী সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) এর সদস্যসচিব আব্দুল করিম কিম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর যে পরিমাণ লুটপাট হয়েছে, তা গত দেড় দশকের ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে। প্রশাসন সেটি ঠেকাতে পারেনি। এখন আবার কোয়ারি চালুর চিন্তা করা হচ্ছে, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’
২০২৫ সালের মার্চে জাফলংয়ে অবৈধ পাথর উত্তোলনের ঘটনায় পরিবেশ অধিদপ্তর ৩১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। পরে ভোলাগঞ্জ এলাকায় পাথর লুটের ঘটনায়ও পৃথক মামলা হয়। একই বছরের আগস্টে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এলেও এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অবৈধ উত্তোলন এখন নদীর তলদেশ ছাড়িয়ে সেতুর পিলার, টিলা এমনকি ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর আশপাশেও পৌঁছে গেছে। গোয়াইনঘাটের জাফলং সেতু ও কোম্পানীগঞ্জের ঢালাই সেতুর পিলারের কাছ থেকে বালু তোলায় স্থানীয়দের মধ্যে সেতুর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি জাফলং রাজবাড়ির ভেতরেও মাটি খুঁড়ে পাথর সরানোর অভিযোগ উঠেছে।
পূর্ব জাফলংয়ের বাসিন্দা মো. আমজাদ হোসেন জানান, আগে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির কারণে এসব অনেকটাই বন্ধ ছিল। এখন আবার আগের মতো শুরু হয়েছে। টহল এলে শ্রমিকরা সরে যায়, টহল চলে গেলে আবার কাজে নেমে পড়ে।
আরেক বাসিন্দা নূরুল ইসলাম জানান, নদীর তলদেশ থেকে বালু তুলে নেওয়ায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বদলে যাচ্ছে। এতে নদীভাঙনের ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবেশও স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়ছে।
শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, পরিবর্তন চোখে পড়ছে পর্যটকদেরও। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুজাহিদ বাপ্পি জানান, জাফলংয়ে আমরা প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখতে আসি। কিন্তু পাথর উত্তোলন চলতে থাকলে এই সৌন্দর্য আর থাকবে না। কয়েক জায়গায় নদীর ভেতরেই পাথর তুলতে দেখেছি।
এদিকে সরকার ঐতিহ্যবাহী হস্তচালিত পদ্ধতিতে সীমিত পরিসরে পাথর উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করছে। এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করেছে।
শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিতভাবে পাথর উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হবে না। যদি চালু হয়, তবে তা হবে কেবল সনাতনী পদ্ধতিতে এবং কঠোর তদারকির আওতায়। পরিবেশের ক্ষতি হয় এমন কোনো কার্যক্রমের অনুমতি সরকার দেবে না।’
তবে পরিবেশবাদীরা সরকারের এই উদ্যোগ নিয়েও উদ্বিগ্ন। এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী বলেন, ‘অবৈধ পাথর উত্তোলন শুধু পরিবেশ নয়, নদী, জীববৈচিত্র্য ও পর্যটনের জন্যও বড় হুমকি। কার্যকর নজরদারি ও স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে এই সংকট কাটবে না।’
বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বেলা) সিলেট আঞ্চলিক সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আক্তার জানান, হাইকোর্টের স্থায়ী আদেশ রয়েছে। সরকার যে সিদ্ধান্তই নিক, তা যেন আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়।
তবে প্রশাসনের দাবি, অবৈধ উত্তোলন ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জানান, জাফলংয়ের ইসিএ এলাকায় নিয়মিত নজরদারি রাখা হচ্ছে। সেখানে পাথর উত্তোলন হচ্ছে না বলেই আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে।
খনিজসম্পদ উন্নয়ন ব্যুরোর পরিচালক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল জানান, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জব্দ করা পাথর ও বালু সরকারি বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হয়।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, অবৈধ পাথর ও বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে গঠিত টাস্কফোর্স নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
পাথর লুট, অবৈধ উত্তোলন, পরিবেশ দূষণ, নদী ধ্বংস, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা, পর্যটন ধ্বংস