উৎপাদন কমলেও সিলেটে সংকট নেই কোরবানির পশুর
ব্যবসা-বাণিজ্য
প্রকাশঃ ১২ মে, ২০২৬ ১০:১০ অপরাহ্ন
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে সিলেট বিভাগের খামারগুলোতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারিরা। কোরবানির পশু মোটাতাজাকরণ, পরিচর্যা ও বাজারজাতের প্রস্তুতিতে দিনরাত কাজ চলছে।
তবে পশুখাদ্যের লাগামহীন দাম, শ্রমিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমান্তপথে চোরাই গরু প্রবেশের আশঙ্কা খামারিদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
তাদের দাবি, উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দামও বাড়বে। যদিও প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, সিলেটে এবার কোরবানিযোগ্য পশুর কোনো সংকট নেই। বরং চাহিদার তুলনায় উদ্বৃত্ত থাকবে ১৩ হাজার ৬৯০টি পশু।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ১৭৪টি। এর বিপরীতে স্থানীয় খামারগুলোতে প্রস্তুত রয়েছে ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৪টি পশু। ফলে চাহিদা পূরণের পরও বাড়তি থাকবে ১৩ হাজার ৬৯০টি পশু। যা দেশের অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের তুলনায় এবছর সিলেটে কোরবানির পশু উৎপাদন কমেছে। ২০২৫ সালে বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ৩ লাখ ৮ হাজার ৫১৫টি। সেই হিসাবে এবার উৎপাদন কমেছে ২২ হাজার ৬৫১টি।
যদিও একই সময়ে চাহিদা সামান্য বেড়েছে মাত্র ৬৯৭টি। এর আগের বছর ২০২৪ সালে বিভাগে উৎপাদিত পশুর সংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৩০ হাজার ৩৯৭টি। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় দেড় লাখ পশু।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খামারিরা এখন অনেক বেশি হিসাব করে উৎপাদনে যাচ্ছেন। অতিরিক্ত খরচ, খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং বাজারের অনিশ্চয়তা অনেককে পশু পালনে নিরুৎসাহিত করেছে। তবু স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পশু দিয়েই এবার চার জেলার চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে বলে তারা মনে করছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এবার সিলেট বিভাগে কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ২৫টি ষাঁড়, ৩৫ হাজার ২৮৭টি বলদ, ২৮ হাজার ৭৯০টি গাভী, ৬ হাজার ৩৬৬টি মহিষ, ৭৩ হাজার ৮৮১টি ছাগল, ১৯ হাজার ৭৮টি ভেড়া এবং ৩ হাজার ৪৩৭টি অন্যান্য পশু।
চার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পশু প্রস্তুত হয়েছে সিলেট জেলায়। এখানে চাহিদা রয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৯৩৮টি পশুর। তার বিপরীতে প্রস্তুত আছে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৫টি। গত বছরের তুলনায় জেলায় চাহিদা বেড়েছে ২০ হাজার ৩৯৭টি এবং উৎপাদন বেড়েছে ৫ হাজার ৭০৭টি। জেলার খামারগুলোতে বর্তমানে ৪৫ হাজারের বেশি ষাঁড় ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বলদ, গাভী, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া রয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলায় এবার কুরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৭১ হাজার ৭৭২টি। প্রস্তুত রয়েছে ৭৪ হাজার ৫৮৪টি পশু। তবে গত বছরের তুলনায় সেখানে চাহিদা কমেছে ৭ হাজার ১৫১টি এবং উৎপাদন কমেছে ৬ হাজার ৫৩টি।
হবিগঞ্জে চাহিদা রয়েছে ৪৬ হাজার ৩৫০টি পশুর। প্রস্তুত রয়েছে ৫০ হাজার ৮০২টি। জেলায় গত বছরের তুলনায় চাহিদা কমেছে ১৯ হাজার ২৩২টি এবং উৎপাদন কমেছে প্রায় ২০ হাজার পশু।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে এবার কুরবানির পশুর চাহিদা বেড়েছে ৬ হাজার ৯৯০টি। প্রস্তুত রয়েছে ৫২ হাজার ৫১৩টি পশু, যা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে বেশি।
খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার পশু পালনে ব্যয় বেড়েছে কয়েক ধাপে। তীব্র গরমে পশুর বাড়তি পরিচর্যা করতে হচ্ছে। অনেক খামারে সার্বক্ষণিক ফ্যান চালিয়ে রাখতে হচ্ছে। পশুর খাবারের সঙ্গে বিশেষ উপাদান মেশানো, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগেও ব্যয় বাড়ছে।
খামারিরা জানান, দেশে প্রচলিত পশুখাদ্যের প্রায় সব উপাদানের দাম বেড়েছে। সয়াবিন খৈল, গমের ভুসি, রাইস পলিশ, সরিষার খৈল, ভুট্টা, মসুর ও মুগের ভুসিসহ অধিকাংশ খাদ্যপণ্যের দাম ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন।
কোরবানির পশুর ব্যবসায়ী রফিক মিয়া বলেন, এবার ঈদের জন্য তিনটা গরুর কিনছি। কয়েক মাসে খাবার ও পরিচর্যায় আরও প্রায় আমার ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এখন যদি কম দামে বিক্রি করতে হয়, তাহলে লাভ তো দূরের কথা, খরচই উঠবে না।
প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলছে, খামারিদের সচেতন করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পশু মোটাতাজাকরণে স্টেরয়েড বা ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি খামারিদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।
সিলেট বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক ড. আবু জাফর মো. ফেরদৌস বলেন, এবার সিলেট বিভাগে কুরবানিযোগ্য পশুর কোনো ঘাটতি নেই। বরং উদ্বৃত্ত পশু থাকবে। তাই বাইরে থেকে পশু আনার প্রয়োজন হবে না। তিনি বলেন, এখন যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা প্রাথমিক। ঈদের আগে আরও কিছু পশু প্রস্তুত হবে। তখন চূড়ান্ত তালিকায় উৎপাদনের ব্যবধান কিছুটা কমে আসতে পারে।
কোরবানির পশু, সিলেট বিভাগ, উৎপাদন