সুনামগঞ্জে ধান গুছানোর সময় বজ্রপাতে স্কুলছাত্রীর মৃত্যু
দৈনন্দিন
প্রকাশঃ ১০ মে, ২০২৬ ৫:৪২ অপরাহ্ন
“মা” শুধু একটি শব্দ নয়, এটি এক আশ্রয়, এক নিরাপত্তা, আর নিঃস্বার্থ ত্যাগের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। মা দিবসের এই বিশেষ দিনে এমনই এক মায়ের গল্প উঠে আসে, যিনি কোনো আলোচনার কেন্দ্র নন, কিন্তু তার জীবনই এক দীর্ঘ অনুপ্রেরণা-রাবিয়া বেগম।
রাবিয়া বেগমের জন্ম সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার ডুংরিয়া গ্রামে। পরবর্তীতে তার বিয়ে হয় একই উপজেলার ঠাকুরভোগ গ্রামের আব্দুল আলীমের সঙ্গে, যিনি সুনামগঞ্জ কোর্টে আইনজীবী সহকারী হিসেবে স্বল্প আয়ের একটি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন পাশাপাশি টিউশনি করাতেন।
জীবনের শুরুটা ছিল খুবই সাধারণ এবং সংগ্রামমুখর। সীমিত আয়ের সংসার আর গ্রামের অনুন্নত সুযোগ-সুবিধার বাস্তবতায় সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে একসময় তারা দু’জনেই চলে আসেন সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ায়। সেই সিদ্ধান্ত ছিল এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে শূন্য হাতে এগিয়ে যাওয়ার মতোই একটি বড় পদক্ষেপ।
রাবিয়া বেগম একজন গৃহিণী। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে গড়ে তুলেছে এক অসাধারণ মানুষ হিসেবে। সংসারের প্রতিটি দায়িত্ব সামলে তিনি একাই বড় করেছেন পাঁচ সন্তানকে। তার জীবনের প্রতিটি দিন কেটেছে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার নীরব সংগ্রামে।
আজ সেই ত্যাগের ফল স্পষ্ট। তার এক ছেলে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত, আরেক ছেলে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছে। এক মেয়ে ইংরেজি বিভাগে মাস্টার্স করছে, আরেক মেয়ে বিএ পড়াশোনা করছে, আর সর্বকনিষ্ঠ সন্তান পড়ছে দেশের একটি শীর্ষ বিদ্যাপীঠে। একক প্রচেষ্টায় গড়া এই সফলতার পেছনে রয়েছেন একজন মা-রাবিয়া বেগম।
ডিজিটাল যুগের এই সময়েও রাবিয়া বেগমের জীবন অনেকটাই সরল। নিজের কোনো মোবাইল ফোন নেই। সংসারের কাজ শেষ হলে তিনি সময় কাটান পাড়ার অন্যান্য নারীদের সঙ্গে গল্প করে, জীবনের ছোট ছোট আনন্দ ভাগ করে নিয়ে।
তার জীবনে নেই বিলাসিতা বা ব্যক্তিগত চাহিদার দীর্ঘ তালিকা। আছে শুধু সন্তানদের ভালো থাকা, তাদের সাফল্য আর একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
স্বল্প আয়ের সংসার, সীমিত সুযোগ আর প্রতিনিয়ত সংগ্রামের মধ্যেও রাবিয়া বেগম প্রমাণ করেছেন একজন মা চাইলে তার ভালোবাসা ও ত্যাগ দিয়েই পুরো পরিবারকে পরিবর্তন করে দিতে পারেন।
রাবিয়া বেগম জানান, ১০ কেজি চাল নিয়ে সুনামগঞ্জে এসেছিলাম। আমার স্বামী অনেক কষ্ট করেছেন, এখনো করছেন। আমি কোনো বড় কিছু চাইনি জীবনে। শুধু চেয়েছি আমার সন্তানরা মানুষ হোক, নিজের পায়ে দাঁড়াক। সংসারে অনেক অভাব ছিল, অনেক কষ্ট ছিল, কিন্তু কখনো সন্তানদের সামনে সেটা বুঝতে দেইনি। নিজের চাওয়া-পাওয়া ভুলে গিয়ে তাদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়েই ভেবেছি সবসময়। আজ তারা যে যার জায়গা থেকে ভালো করার চেষ্টা করছে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় শান্তি। একজন মায়ের সুখ তো এখানেই, সন্তানের হাসিতে, সন্তনের সফলতায়।
রাবিয়া বেগমের চতুর্থ সন্তান তানজিনা আলীম জানান, আমার মা সারাজীবন ধরে কষ্ট করে যাচ্ছেন। আমার মায়ের স্বাক্ষর দেওয়া ও কোরআন শরীফ পড়তে পারা ছাড়া আর কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। তবু তিনি আমাদের ৫ ভাই বোনকে অনেক কষ্টে লেখাপড়া করিয়েছেন। আমরা আমাদের মায়ের অক্লান্ত শ্রমঘামের কারনে এই পর্যন্ত এসেছি। মা দিবস তো একটা বিশেষণ মাত্র আমরা আমাদের মাকে প্রতিদিনই ভালোবাসি।
মা দিবসে রাবিয়া বেগমের এই গল্প শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি সেই সব মায়েদের গল্প, যারা নীরবে জীবন সংগ্রাম করেন, কিন্তু সন্তানের জীবনে হয়ে ওঠেন সবচেয়ে বড় শক্তি। রাবিয়া বেগম একজন সাধারণ মা, কিন্তু তার ত্যাগ তাকে করেছে অসাধারণ।
সুনামগঞ্জ, রাবিয়া বেগম, মা, মা দিবস