০৯ মে ২০২৬

কৃষি / চাষাবাদ

ঋণের ভারে ভিটেমাটি ছাড়ার শঙ্কায় হাওরের কৃষকরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ৯ মে, ২০২৬ ২:১৭ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন রোদের ঝলকানি। কয়েক সপ্তাহের টানা বৃষ্টির পর আকাশ পরিষ্কার হয়েছে, মাঠে নেমেছে স্বস্তির আলো। কিন্তু এই রোদ কৃষকের মুখে হাসি ফেরাতে পারেনি। বরং ফসলহীন মাঠের দিকে তাকিয়ে আরও গভীর হচ্ছে তাদের হতাশা। কারণ, যে বোরো ধান ছিল বছরের একমাত্র ভরসা, তা পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ার পর এখন সামনে শুধু অনিশ্চয়তা।


হাওরের বিভিন্ন এলাকায় ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ। কোথাও কোথাও কৃষকেরা নষ্ট হয়ে যাওয়া ধানের যা সামান্য অবশিষ্ট আছে, সেটুকু রোদে শুকিয়ে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অধিকাংশ কৃষকের জন্য সেটিও সম্ভব হয়নি। ফসল হারিয়ে এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা—কীভাবে শোধ হবে লাখ লাখ টাকার ঋণ।


সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের দেখার হাওরে গিয়ে দেখা গেছে, হাছনপছন্দ গ্রামের কৃষক ইনচান আলী এবার প্রায় আট একর জমিতে বোরো চাষ করেছিলেন। স্বপ্ন ছিল ভালো ফলনের। কিন্তু এক রাতের পানিতেই সব শেষ।


ইনচান আলী বলেন, জমি করতে গিয়ে মানুষের কাছ থেকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা ধার নিয়েছি। ভেবেছিলাম ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করব। এখন তো নিজের জমির ধানই পাইনি। কথার মাঝেই চোখ ভিজে ওঠে তার। তিনি জানান, পাওনাদারদের চাপ দিন দিন বাড়ছে। তাই বড় ছেলেকে নিয়ে অন্য শহরে গিয়ে কাজ করার কথা ভাবছেন।


একই চিত্র পাশের গ্রামের কৃষক সাহেব আলীর জীবনেও। সাড়ে তিন লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফসলহানির পর এখন পরিবার চালানোই বড় চ্যালেঞ্জ। কয়েক দিন আগে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় মাঠেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি।


কৃষিকাজে জড়িতরা জানান, শুধু গুয়ারছুড়া, রৌয়ারপাড় ও হাছনপছন্দ এলাকায় অন্তত ২০ জন বর্গা চাষি ঋণ করে চাষবাস করে এমন বিপদে পড়েছেন। তাদের অনেকেই অন্যের জমি নিয়ে চাষ করেছিলেন। ফলে ফসল না থাকলেও জমির খরচ ও ঋণের দায় থেকেই যাচ্ছে।


সংকট আরও গভীর করেছে এনজিওর কিস্তির চাপ। এ ব্যাপারে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ফসলহানির মধ্যেও বিভিন্ন ঋণদান সংস্থার কর্মীরা নিয়মিত কিস্তি আদায়ে বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। এতে মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়ছেন তারা।


এ ব্যাপারে কথা হয় এলাকায় ঋণের কিস্তি তুলতে আসা এক কর্মীর সাথে। তার নাম একা বেগম। তার সাথে কথা হলে একা বেগম জানান, এই এলাকায় আমাদের ছয় কোটি টাকা ঋণ দেওয়া আছে। কিস্তি দেবে না এখনও কেউ জানায়নি। তাছাড়া আমরা প্রবাসী ও কৃষি দুই ধরনের ঋণ দিয়ে থাকি। কারো সমস্যা থাকলে তিনি অফিসে যোগাযোগ করবেন জানিয়ে তিনি চলে যান। 


এদিকে জেলার মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা হাওরের কৃষি ও কৃষক বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সুনামগঞ্জ জেলার আহ্বায়ক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা না দিলে অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হবে।


এ ব্যাপারে কথা হলে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৯৮ হাজার কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই শেষে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রশাসন।


শেয়ার করুনঃ

কৃষি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ হাওর, কৃষকের দুর্দশা, বোরো ধান ক্ষতি, ঋণে কৃষক, হাওরের ফসলহানি

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ