
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা অনেকটাই নির্ভরশীল বোরো ধানের ওপর। কিন্তু প্রায় প্রতি বছর আগাম বন্যার কারণে তাদের সেই একমাত্র অবলম্বন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতায় কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তা ও জীবনমান রক্ষায় বড় পরিসরের নদী ও খাল পুনঃখনন প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে সরকার।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪২৯ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বোরো মৌসুমে আকস্মিক বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা করাই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর আওতায় প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি সুরক্ষার আওতায় আনা হবে।

‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদনের আগে যাচাই-বাছাই করতে আগামী বৃহস্পতিবার প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় হাওর এলাকার নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে ১৩টি নদীর প্রায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার অংশে ড্রেজিং করা হবে। পাশাপাশি প্রায় ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন, সিসি ব্লক আর্মারিং ৩ কিলোমিটার, ফ্লাড ফিউজ নির্মাণ ১২টি এবং একটি অনাবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্প এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ সদর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, শান্তিগঞ্জ, জগন্নাথপুর, দিরাই ও শাল্লা উপজেলা। এছাড়া ময়মনসিংহ জেলার খালিয়াজুড়ি এবং কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা, মিঠামইন, নিকলি, বাজিতপুর ও ভৈরব উপজেলাও এর আওতায় আসবে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা, আগাম বন্যা থেকে বোরো ধান রক্ষা করা, ঝুঁকিপূর্ণ ডুবন্ত বাঁধে সিসি ব্লক আর্মারিংয়ের মাধ্যমে সেগুলোকে শক্তিশালী করা, ফ্লাড ফিউজ নির্মাণের মাধ্যমে নৌ-চলাচল সহজ করা এবং হাওর অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটানো।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে। ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং হাওর অঞ্চলের কৃষকদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রস্তাবিত ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে নদী ড্রেজিংয়ের খরচ নিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। প্রস্তাবে প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে প্রায় ১৯৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা অনুরূপ অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। ফলে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে ব্যয়ের যৌক্তিকতা যাচাই করা হবে।
এদিকে হাওরের ফসল রক্ষায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব (দুলু)। মঙ্গলবার (৫ মে) তিনি বলেন, হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে এবং হাওর পরিস্থিতি নিয়ে করণীয় সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন। হাওরে ঠিকাদার পোষা, আর এদিক-ওদিক করার প্রকল্প নেওয়া যাবে না। জনগণের টাকা অপচয় করা যাবে না।
আসাদুল হাবিব বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা নিয়ে কিছু কথা শোনা যাচ্ছে। তালিকা তৈরিতে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা টানা তিন মাস সরকারের সহযোগিতা পাবেন। এ জন্য তাদের কার্ড দেওয়া হবে। হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই গণতান্ত্রিক সরকার সব সময় থাকবে।
সুনামগঞ্জ একফসলি এলাকা উল্লেখ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী বলেন, কৃষকেরা এই ফসলের ওপরই নির্ভরশীল। হাওরে বজ্রপাতের মৃত্যুঝুঁকি কমাতে বেশি বেশি শেল্টার (আশ্রয়কেন্দ্র) নির্মাণ করা হবে। সরকার অনেক জায়গায় বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র করে। কিন্তু সুনামগঞ্জে সেরকম হবে না। আমরা ছোট ছোট অনেক কৃষক আশ্রয়কেন্দ্র হাওরে করে দেব। এগুলোতে বজ্রনিরোধক দণ্ড ও সাইরেনের ব্যবস্থা থাকবে। দুর্যোগ মুহূর্তে কৃষকদের দ্রুত এই এসব শেল্টারে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানানো হবে।
শেয়ার করুনঃ
কৃষি থেকে আরো পড়ুন
হাওর, সরকার, ফসলরক্ষা, প্রকল্প

