১৮ মে ২০২৬

ইতিহাস-ঐতিহ্য / ইতিহাস

যে ঈদগাহে মিশে আছে শহীদের রক্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২১ মার্চ, ২০২৬ ৭:৩৫ অপরাহ্ন


সিলেট নগরের শাহী ঈদগাহ শুধু একটি নামাজের স্থান নয়, এটি বহন করে ইতিহাসের এক গৌরবগাথা। ধর্মীয় গুরুত্বের পাশাপাশি এই ঈদগাহ জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সঙ্গে। প্রায় তিন শতাব্দী পুরোনো এই স্থাপনাটি আজও স্মরণ করিয়ে দেয় স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করা মানুষের কথা।

পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর মাত্র কয়েক দশক পর, ১৭৮২ সালের আশুরার দিন সিলেটে ঘটে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। হিজরি ১০ মহররমের সেই দিনে শাহী ঈদগাহের টিলায় সমবেত হন স্থানীয় মানুষ। সেখান থেকেই শুরু হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ। নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ হাদি ও সৈয়দ মাহদি যারা স্থানীয়ভাবে হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া নামে পরিচিত।

ঐতিহাসিকদের মতে, এটি ছিল অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী প্রাথমিক দিককার বিদ্রোহগুলোর একটি। এমনকি ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহেরও বহু বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল এই ঘটনা। তবে শক্তিশালী ও সুসংগঠিত ব্রিটিশ বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে টিকতে পারেননি বিদ্রোহীরা। গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন হাদা মিয়া ও মাদা মিয়া। ইতিহাসে এই ঘটনাটি ‘হাদা-মাদা বিদ্রোহ’ নামে পরিচিত।

জানাযায়, তৎকালীন ব্রিটিশ কালেক্টর রবার্ট লিন্ডসের শাসনামলে স্থানীয়দের ওপর অত্যাচার ও অর্থনৈতিক শোষণ বাড়তে থাকে। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমতে থাকে। সেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে আশুরার দিন শাহী ঈদগাহে। সংগঠিত পরিকল্পনার অভাব থাকলেও স্থানীয় মানুষের সাহসিকতা ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

শাহী ঈদগাহের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও নানা ঐতিহাসিক স্মৃতি। বিভিন্ন সময়ে এখানে সমাবেশ করেছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নেতারা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে এই স্থানটি ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সচেতনতার কেন্দ্র।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৮শ শতকের শুরুর দিকে তৎকালীন ফৌজদার ফরহাদ খাঁর উদ্যোগে নির্মিত হয় এই ঈদগাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি সিলেটের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশস্থলে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ঈদের নামাজ আদায় করতে পারেন।

স্থাপত্যশৈলীতেও রয়েছে এর স্বাতন্ত্র্য। টিলার ওপর নির্মিত এই ঈদগাহে উঠতে হয় দীর্ঘ সিঁড়ি বেয়ে। ওপরে রয়েছে একাধিক গম্বুজ, চারপাশে সীমানা প্রাচীর এবং বিভিন্ন প্রবেশদ্বার। পাশেই রয়েছে একটি বড় পুকুর, যা পুরো পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এখানে নির্মিত হয়েছে উঁচু মিনার, যা দর্শনার্থীদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ যোগ করেছে।

প্রতিদিনই ধর্মপ্রাণ মানুষ ছাড়াও অনেক দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক স্থানে আসেন। তবে ঈদের সময় এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। হাজারো মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।


শেয়ার করুনঃ

ইতিহাস-ঐতিহ্য থেকে আরো পড়ুন

সিলেট, শাহী ঈদগাহ, শহীদ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ