১৭ মে ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

যেখানে দরকার নেই, সেখানেই প্রকল্প: সুনামগঞ্জে অপচয় ২০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১১ মার্চ, ২০২৬ ৩:২৫ অপরাহ্ন


সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে চলতি মৌসুমে শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অন্তত ২০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যেখানে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের প্রয়োজন নেই, সেখানেও বাঁধের নামে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। কোথাও আবার বাঁধের টাকায় গ্রামের সড়ক সংস্কার করা হয়েছে। সরকারি বরাদ্দ ভিন্ন খাতে ব্যবহার ও লুটপাটের অভিযোগে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তারা এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) গঠন করা হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও অনেক জায়গায় এখনো কাজ চলমান রয়েছে। মন্ত্রণালয় আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে।

সরেজমিনে ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের বাদে গোরেশপুর গ্রামে কখনো হাওরের বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন হয়নি। অতীতে সেখানে কোনো প্রকল্পও নেওয়া হয়নি। কিন্তু এবার ওই গ্রামের মিজানুর রহমানকে সভাপতি করে ২২ লাখ ৫৬ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দ দিয়ে গ্রামের একটি সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নামে সামান্য মাটি ফেলে কাজ দেখানো হয়েছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, সড়কে মাত্র ৫–৬ ইঞ্চি করে মাটি ফেলা হয়েছে। এতে প্রকল্পের বড় অংশের টাকা আত্মসাতের আশঙ্কা করছেন গ্রামবাসী।

গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, এটা কোনো হাওরের বেড়িবাঁধ নয়। আমরা চেয়েছিলাম গ্রামের রাস্তাটা ভালোভাবে সংস্কার হোক। কিন্তু পিআইসি সভাপতি মাত্র ৫–৬ ইঞ্চি মাটি ফেলেছেন। বড়জোর এক লাখ টাকার কাজ হয়েছে। আমরা বিষয়টি ইউএনওকে মৌখিকভাবে জানিয়েছি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য আলী হোসেন বলেন, আমাদের গ্রামে হাওরের বাঁধের কোনো প্রয়োজন নেই। গ্রামের স্বার্থে যদি কাজটা ঠিকভাবে হতো তাহলে আমরা খুশি হতাম। কিন্তু কাজটি সঠিকভাবে করা হয়নি।

এ ধরনের অভিযোগ শুধু দোয়ারাবাজারেই নয়, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর ও দিরাই-শাল্লাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সুবিধাবাদীদের মাধ্যমে অন্তত শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে প্রায় ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের টাকা ভিন্ন খাতে ব্যবহার ও লুটপাটের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

জামালগঞ্জ উপজেলার রৌয়াখাড়া এলাকায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকার একটি প্রকল্প (৩৯ নম্বর পিআইসি) নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আমিরুল হক বলেন, এখানে শুধু খালের মুখে সামান্য একটি ভাঙন আছে। বড়জোর ৪০–৫০ হাজার টাকা খরচ হলেই ঠিক হয়ে যেত। অথচ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প দেখিয়ে বড় বরাদ্দ নেওয়া হয়েছে।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা জানান, চলতি বছর প্রতিটি উপজেলায় কৃষকের ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দ দিয়ে বাড়ির রাস্তা, গ্রামের রাস্তা এমনকি ব্যক্তিগত রাস্তা উন্নয়নের নামে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যা কাবিটা নীতিমালার পরিপন্থী এবং এতে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে জেলার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলোর তথ্য প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, অতীতের মতো এবারও হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দ নিয়ে লুটপাটের ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। জেলা কাবিটা কমিটি উপজেলাগুলোকে এসব পিআইসি অনুমোদন দিতে বাধ্য করেছে। এতে সরকারি কোটি কোটি টাকা লোপাটের আশঙ্কা রয়েছে। কৃষকের বরাদ্দ অন্য খাতে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার উপজেলার পাউবোর সাব-স্টেশন কর্মকর্তা সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমার উপজেলায় কাজ তুলনামূলক কম। বাদে গোরেশপুর গ্রামে অতীতে হাওরের কোনো কাজ হয়নি এটা সত্য। তবে প্রকল্প অনুমোদনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

সুনামগঞ্জ, হাওর, ফসল রক্ষা বাঁধ, অপচয়, সরকার

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ