১৮ আগস্ট ২০২৬

ব্যবসা-বাণিজ্য / আমদানি-রপ্তানি

ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর

২০ বছর ধরে চুনাপাথর আমদানিতেই সীমাবদ্ধ, রপ্তানীতে শূন্য

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ১০:৫০ অপরাহ্ন

ছবিঃ ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর। সিলেট ভয়েস

প্রায় ২০ বছর ধরে সিলেটের ভোলাগঞ্জ দিয়ে ভারত থেকে শুধু চুনাপাথর আমদানি হচ্ছে। একসময় এটি ছিল শুল্ক স্টেশন। ২০১৯ সালে সেটিকে স্থলবন্দর ঘোষণা করে সরকার। 


এরপর ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় আধুনিক স্থলবন্দর। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর আট মাস পেরিয়ে গেলেও আমদানি-রপ্তানির চিত্রে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। 


বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক চুনাপাথর দেশে ঢুকছে। তবে চুনাপাথর ছাড়া অন্য কোনো পণ্য আমদানি বা রপ্তানির কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। 


ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, শুল্ক স্টেশন থাকাকালে যে পরিমাণ চুনাপাথর আমদানি হতো, স্থলবন্দর চালুর পরও একই পরিমাণ পাথর আসছে। ফলে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থলবন্দরের সুফল তাঁরা খুব একটা পাচ্ছেন না। তাঁদের মতে, স্থলবন্দর নির্মাণের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।


সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৫ সাল থেকে ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন দিয়ে ভারত থেকে চুনাপাথর আমদানি শুরু হয়। ভোলাগঞ্জের ওপারে ভারতের খাসি হিলস জেলার মাজাই এলাকার ব্যবসায়ীরা এ পথে চুনাপাথর রপ্তানি করেন। সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর ব্যবহার করলে তাদের প্রায় ১৬০ কিলোমিটার পথ ঘুরতে হয়। এ কারণে তুলনামূলক সহজ পথ হিসেবে ভোলাগঞ্জ শুল্ক স্টেশন ব্যবহার করে আসছেন তাঁরা।


দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে চুনাপাথর আমদানি-রপ্তানি শুরুর ২০ বছর পরও ভারত অংশে কোনো শুল্ক স্টেশন বা স্থলবন্দর গড়ে ওঠেনি। অথচ বাংলাদেশ অংশে শুল্ক স্টেশন বিলুপ্ত করে স্থলবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে।


২০১৯ সালে ভোলাগঞ্জ স্থলশুল্ক স্টেশনকে স্থলবন্দর ঘোষণা করা হয়। এরপর জমি অধিগ্রহণসহ নানা প্রক্রিয়া শেষে ১৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থলবন্দর নির্মাণ শুরু হয়। তৎকালীন সরকার জানিয়েছিল, স্থলবন্দরটি চালু হলে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।


গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন। উদ্বোধনের সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর শুধু আমদানি-রপ্তানিকেন্দ্রিক নয়, এটি পর্যটনবান্ধব হিসেবেও গড়ে তোলা হয়েছে।


সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে বন্দরের ভেতরে আধুনিক ক্যাফেটেরিয়া, মসজিদ, কাঁচঘেরা দোতলা পোর্ট ভবন, তিনতলা মাল্টি এজেন্সি ভবন, একটি গেস্ট হাউস, দুটি ডরমেটরি ও একটি ক্লিনিক নির্মাণ করা হয়েছে। পর্যটকদের জন্য পার্কিং, চিকিৎসাসেবা, খাবার ও থাকার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। প্রতিটি স্থাপনার জন্য আলাদা সড়কব্যবস্থাও রয়েছে।


তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্দর উদ্বোধনের পর ক্যাফেটেরিয়া লিজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে পানসি রেস্টুরেন্ট চালু রয়েছে। রেস্টুরেন্ট ও মসজিদ ছাড়া বন্দরের অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পর্যটকেরা খুব একটা ব্যবহার করতে পারছেন না।


সিলেট-ভোলাগঞ্জ সড়কের পাশে নির্মিত স্থলবন্দরটির অবকাঠামো বেশ দৃষ্টিনন্দন। তিনটি কাঁচঘেরা ভবন, সামনে খোলা জায়গা ও ফুলের বাগান রয়েছে। বন্দরের পেছনের অংশে বাংলাদেশ-ভারত শূন্যরেখা। সেখানে রয়েছে বিশাল খোলা জায়গা।


আধুনিক অবকাঠামো ও নানা সুযোগ-সুবিধা থাকলেও ভবনগুলোতে নেই তেমন কর্মচাঞ্চল্য। অনেকটা ফাঁকা পড়ে আছে পুরো এলাকা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, প্রতিদিন যে পরিমাণ চুনাপাথর আসে, সেগুলো ওই দিনই খালাস করে দেওয়া হয়। ফলে বন্দরে পণ্য সংরক্ষণ বা দীর্ঘ সময় ধরে পণ্য ওঠানামার প্রয়োজন হয় না।


ভোলাগঞ্জ চুনাপাথর আমদানিকারক গ্রুপের সভাপতি সাহাব উদ্দিন বলেন, তৎকালীন সরকার ভারতকে খুশি করতে ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর নির্মাণ করেছে। ভোলাগঞ্জ দিয়ে চুনাপাথর ছাড়া অন্য কিছু আমদানি করা হয় না। তা জানার পরও স্থলবন্দর করা হয়েছে। মূলত লুটপাট করতেই এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে শেখ হাসিনার সরকার।


তিনি আরও বলেন, শুল্ক স্টেশন থাকাবস্থায়ও ২০০ থেকে ৩০০ ট্রাক পাথর আমদানি করা হতো। এখনও একই পরিমাণে চুনাপাথর আমদানি হচ্ছে। স্থলবন্দরের সুবিধা বলতে আলাদা কিছু নেই। কর্মকর্তা তারা গেস্ট হাউস ব্যবহার করেন। সব সুবিধা তাদের।


স্থানীয় ব্যবসায়ী মুর্শেদ আলম বলেন, ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর দিয়ে শুধুমাত্র চুনাপাথর আমদানি করা হয়। অন্য কোনো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হয় না। ২০ বছর ধরেই শুধু চুনাপাথরই আমদানি হচ্ছে।


ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে স্থলবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি চলছে। এখন প্রতিদিন তিন শতাধিক ট্রাক চুনাপাথর চুনাপাথর ভারত থেকে আমদানি করা হয়। প্রতিটি ট্রাকে ১১ থেকে ১২টন পাথর থাকে।


তিনি বলেন, বন্দর দিয়ে সকল ধরণের পণ্য আমদনি করার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো পণ্য আমদানি না করায় শুধু চুনাপাথরই আমদানি করা হয়।


বন্দরের ক্যাফেটেরিয়া পানসি রেস্টুরেন্টকে এ বছরের জন্য লীজ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিমাসে ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। এ ছাড়াও বন্দরের মসজিদ সহ অপারেশন এলাকা ছাড়া অন্যান্য স্থান পর্যটকরা ঘুরে দেখার সুযোগ রয়েছে।


শেয়ার করুনঃ

ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে আরো পড়ুন

ভোলাগঞ্জ স্থলবন্দর, আমদানি-রপ্তানি, চুনাপাথর, বাণিজ্য, ভারত-বাংলাদেশ

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ