১৮ আগস্ট ২০২৬

অভিবাসন

ভূমধ্যসাগরে প্রাণহানি

নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ৬, দালালদের ভয়ে মুখ খুলছেন না পরিবার-স্বজন

নোহান আরেফিন নেওয়াজ, শান্তিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ

প্রকাশঃ ১৭ আগস্ট, ২০২৬ ৮:২৮ অপরাহ্ন

ছবিঃ নিখোঁজ শান্তিগঞ্জের ৬ যুবক। সংগৃহীত

উন্নত জীবনের আশায় অবৈধপথে লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে খাবার ও পানির সংকটে অন্তত ১১ বাংলাদেশি অভিবাসনপ্রত্যাশীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। একই নৌকায় থাকা সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবকের কোনো সন্ধান মিলছে না। 


এর আগে পাঁচজন নিখোঁজের খবর পাওয়া গেলেও নতুন করে আরও একজনের সন্ধান না পাওয়ায় নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। এদিকে নিখোঁজ সন্তানরা কোথায়, কী অবস্থায় দিন পার করছেন কিংবা তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে হতাশা-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন তাদের পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা। তবে দালালচক্রের ভয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না তারা। 


এ অবস্থায় দালালদের বিরুদ্ধে মুখ খুললে নিখোঁজ স্বজনদের জীবিত উদ্ধারের পথ আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা।


নিখোঁজ অভিবাসনপ্রত্যাশী যুবকরা হলেন, পশ্চিম পাগলার শত্রুমর্দন গ্রামের হৃদয় পাল, পূর্ব পাগলা ইউনিয়নের চিকারকান্দি গ্রামের এনামুল খাঁন, রিপন মিয়া, মামুন খাঁন, রনসী গ্রামের মো. তালহা, দরগাপাশার সিচনী গ্রামের সাগর পাল। 


নিখোঁজ হৃদয় পালের বাবা রন্টু পাল জানান, গত ৩১ জুলাই সর্বশেষ হৃদয়ের সাথে মুঠোফোনে কথা হয়। এসময় হৃদয় জানায় ২-১ দিনের মধ্যেই সে লিবিয়া থেকে গ্রীসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। এটাই ছিল হৃদয়ের সাথে সর্বশেষ কথা। এরপর আর হৃদয়ের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। 


তিনি আরও বলেন, লিবিয়ায় বসবাসরত মানবপাচারকারী চক্রের উমর আলী ও শান্তিগঞ্জের ডুংরিয়া গ্রামের দালাল কদ্দুস আলীর সাথে ১৩ লাখ টাকার চুক্তিতে হৃদয়কে প্রথমে ঢাকা থেকে ভারত পাঠানো হয়। ভারত থেকে শ্রীলংকা হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সেখান থেকে লিবিয়া পাঠানো হয় হৃদয়কে৷ তবে লিবিয়া থেকে গ্রীস পাড়ি দেওয়ার সময় থেকে নিখোঁজ রয়েছে ওই যুবক৷ এ ঘটনার খোঁজ নিতে শান্তিগঞ্জ থানা পুলিশের একটি টিম রন্টু পালের বাড়ি পরিদর্শন করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। 


অপর নিখোঁজ যুবকের মামুনের চাচা বলেন, আমার ভাতিজা লিবিয়া থেকে ৩ আগষ্ট সাগরপথে গ্রীসে পাড়ি জমায়। ওইদিন আমাদের সাথে ফোনকলে কথা হয় তার। এরপর থেকে আর মামুনের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। 


এ ঘটনায় জীবিত উদ্ধার হয়ে মিশরের একটি হাসপাতালে শান্তিগঞ্জের আরও ৪ যুবক চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে। 


তারা হলেন, দরগাপাশা ইউনিয়নের সিচনী গ্রামের বদরউদ্দিন আহমদ কামরান, একই ইউনিয়নের বুরুমপুর গ্রামের আলিম উদ্দিন এবং পাথারিয়া ইউনিয়নের আবু সাইদ ও আব্দুল করিম। তারা প্রত্যেকের শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে বলে জানিয়েছে তাদের পরিবার। তবে চিকিৎসাধীন স্বজনদের নিরাপত্তার স্বার্থে দালালদের বিষয়ে মুখ খুলতে অনিহা প্রকাশ করেছেন তারা। 


মিশরে চিকিৎসাধীন পাথারিয়া ইউনিয়নের আব্দুল করিম এক ভিডিও বার্তায় ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমরা ৪২ জন গ্রীসের উদ্দেশ্যে লিবিয়া থেকে রওনা হয়েছিলাম। গ্রীসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।’


কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই নয়জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।


তিনি বলেন, আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।


এ বিষয়ে শান্তিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওলিউল্লাহ বলেন, ‘এ বিষয়ে ভুক্তভোগী কোনো পরিবারে পক্ষ থেকে কেউ যোগাযোগ করেনি। আমরা নিজ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছি।’


শেয়ার করুনঃ

অভিবাসন থেকে আরো পড়ুন

ভূমধ্যসাগর, দালালচক্র, শান্তিগঞ্জ, অবৈধপথ, অভিবাসনপ্রত্যাশী, মানবপাচারকারী

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ