১২ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ৪৯.২ মিমি, সিলেটে ফের বজ্রবৃষ্টির সম্ভাবনা
প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ
প্রকাশঃ ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ ১২:১৪ অপরাহ্ন
২০০৫ সালের ভয়াবহ টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণের ২১ বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনে ফিরে আসেনি স্বাভাবিকতা। বরং সময় যত গড়িয়েছে, ক্ষতিপূরণ আর দায়বদ্ধতার প্রশ্ন ততটাই ঝাপসা হয়েছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে (ইকসিড) বাংলাদেশের ‘জয়’ ঘোষণার পরও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫ শতাংশেরও কম ক্ষতিপূরণ।
ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড) কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকোকে বাংলাদেশ সরকারকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) রাতে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, রায়ে বিস্ফোরণের সময় পুড়ে যাওয়া ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশসহ অন্যান্য ক্ষতির জন্য ২ মিলিয়ন ডলার সব মিলিয়ে প্রায় ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়েছে। বাংলাদেশ অবশ্য গ্যাসের ক্ষতি বাবদ ১১৮ মিলিয়ন এবং রাষ্ট্রের সার্বিক ক্ষতি বাবদ ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার চাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি পরিবেশগত ক্ষতি ও স্বাস্থ্যগত ক্ষতি যোগ করার আবেদন করে বাংলাদেশ।
রেজানুর রহমান বলেন, ইকসিড থেকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাংলাদেশ দিতে বলা হয়েছে। এখন আইনজীবীদের মতামত নিয়ে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজারে টেংরাটিলা (ছাতক-২) গ্যাসকূপে প্রথম ব্লো-আউট ঘটে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন ২০০ থেকে ৩০০ ফুট উঁচুতে ওঠানামা করে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে। দ্বিতীয় দফা বিস্ফোরণ ঘটে একই বছরের ২৪ জুন গভীর রাতে। তখন আগুনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে।
দু’দফা অগ্নিকাণ্ডে কমপক্ষে ৩ বিসিএফ গ্যাস পুড়ে যায় এবং ৫২ বিসিএফ পর্যন্ত গ্যাস রিজার্ভ ধ্বংস হয় যার বাজারমূল্য সেই সময়ই ছিল হাজার হাজার কোটি টাকা। টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, শান্তিপুরসহ আশপাশের গ্রাম ও হাওরের ফসলি জমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার ক্ষত আজও বুকে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে সাধারণ মানুষদের।
বিস্ফোরণের দুই দশক পরও টেংরাটিলা ও সিলেটের হরিপুর গ্যাসফিল্ড এলাকায় মাটির ফাটল দিয়ে নিয়মিত গ্যাস বের হচ্ছে। কোথাও নলকূপের পানি থেকে, কোথাও পুকুরের পানিতে দিয়াশলাই ধরালেই জ্বলে উঠছে আগুন। সম্প্রতি হরিপুরের উতলারপার এলাকায় পরিত্যক্ত একটি কূপের পাশে নতুন করে ফাটল দেখা দিয়েছে। গ্যাসফিল্ড কর্তৃপক্ষ সেখানে ‘বিপজ্জনক’ সতর্কবার্তা জারি করেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঝুঁকির মধ্যেই বছরের পর বছর কাটছে তাদের জীবন। পানযোগ্য পানির সংকট, ফসল উৎপাদনে সমস্যা, নানা রোগবালাই যেন নিত্যসঙ্গী।
টেংরাটিলা এলাকার বাসিন্দা ফিরোজ মিয়া বলেন, আমাদের এখানে এখনও আগুন উঠে, আমরা পানিটাও অনেক দূর থকি আনিয়া খাই। যে সময় এই ঘটনা অইছিল তখন আমার বয়স আছিল ২৭ বছর নতুন বিয়া করছিলাম আজকে ২১ বছর অইগেছে এক বিস্ফোরণ আমরা সবার জীবন ওলট পালট করি দিসে। এখনও মাটি থকি গ্যাস আয় অনেক কষ্ট হয় আমরার ইকানো থাকতে তারপরও আমরাকে কেউ এতো বেশি মনে করে না।
এদিকে সসরকার গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টেংরাটিলার দুর্ঘটনাটি কূপ-নকশা ও খননকাজের গুরুতর ত্রুটির ফল। যথাযথ কেসিং না করায় গ্যাস নরম বালির স্তরে ছড়িয়ে পড়ে এবং অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভূ-পৃষ্ঠে উঠে আসে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৭ সালের মাগুরছড়া দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও একই ধরনের ভুল আবার করা হয়েছিল।
বাপেক্স ও নাইকোর যৌথ মূল্যায়নে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের মোট মজুদ ধরা হয় প্রায় ৪০০ বিসিএফ, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা। শুধু দুর্ঘটনাকবলিত গ্যাসস্তরেই ছিল প্রায় ১১৫ বিসিএফ গ্যাস, যার মূল্য প্রায় ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা।
এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে প্রাপ্ত ৫১৬ কোটি টাকা মোট দাবির তুলনায় ৫ শতাংশেরও কম। পরিবেশগত ক্ষতি, মানুষের সম্পদ ও জীবিকার ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ আর্থিক হিসাব আজও হয়নি।
হাওর এরিয়া আপলিফটমেন্ট সোসাইটির (হাউস) নির্বাহী পরিচালক সালেহীন চৌধুরী শুভ বলেন, নাইকোর মামলায় বাংলাদেশের জয়টা শুধু খাতা কলমে হয়েছে, বাংলাদেশ বিজয়ী এতটুকু। ক্ষতিপূরণ যেখানে চাওয়া হয়েছিল ১২ হাজার কোটি টাকার উপরে সেখানে মাত্র ৫১৬ কোটি টাকা পাওয়াটা আমাদের জন্য লজ্জার। ক্ষতিপূরণের টাকা কি পরিবাররা পাবে। আজকে ২১ বছর পর যখন রায় হল ক্ষতিপূরণের দিক থেকে জয়ী কিন্তু হয়েছে কানাডাই।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সিলেট জেলার সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজাও মনে করেন ক্ষতির তুলনায় পাওয়া ক্ষতিপূরণের টাকা কিছুই না।
তিনি বলেন, আমাদের যে দাবি ছিল সেই দাবির তুলনায় পাওয়ার ক্ষতিপূরণের টাকার পরিমান আসলে কিছুই না। ক্ষতিটা দীর্ঘমেয়াদী যার রেশ কিন্তু এখনও ওই এলাকার মানুষদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। সরকারকে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবেশের অবকাটামো উন্নয়নে কাজ করতে হবে। বৃক্ষরোপন থেকে শুরু করে অত্র অঞ্চলের মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে।
নাইকো, সুনামগঞ্জ, গ্যাস, ক্ষতিপূরণ, বাংলাদেশ, কানাডা