সিলেটে ১১ দলীয় জোটের সমাবেশে সরকারকে কড়া বার্তা শফিকুর–নাহিদ–মামুনুলদের
রাজনীতি
প্রকাশঃ ২৫ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৬ অপরাহ্ন
জুলাই সনদ ও গণভোটের গণরায় দ্রুত বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে সিলেটে বিভাগীয় সমাবেশ করেছে ১১ দলীয় ঐক্য। সমাবেশ থেকে জোটের শীর্ষ নেতারা সরকারকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তা না হলে রাজপথে আন্দোলনের কঁড়া হুঁশিয়ারিও দেন নেতারা ।
একই সঙ্গে তারা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ এবং সিলেটের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন দাবিগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘ভালোয় ভালোয় জুলাই সনদ মেনে নিন। যদি না মানেন, তাহলে এই দেশের মানুষ জীবন দিয়ে, পঙ্গুত্ব বরণ করে, গুলি খেয়ে শিখে নিয়েছে মুক্তির পথে কীভাবে হাঁটতে হয়।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘বর্তমানে যারা সরকার পরিচালনা করছেন, তারাও একসময় নির্যাতিত ছিলেন। কিন্তু এখন তারা সেই অভিজ্ঞতা ভুলে গিয়ে আওয়ামী লীগের শাসনব্যবস্থার পথেই হাঁটছেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দলীয়করণ ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের শহীদদের সঙ্গে বেইমানি করব না। জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে বেইমানি করব না। ১৮ কোটি মানুষের সঙ্গে বেইমানি করব না।’
গণভোটের প্রসঙ্গ তুলে জামায়াতের আমির বলেন, ‘পরিবর্তন ও সংস্কারের পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মত দিয়েছেন। সেই গণরায় বাস্তবায়ন না হলে জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে অসম্মান করা হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা গণভোটকে অপমান করতে দেব না। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আমাদের আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাবে। বাংলাদেশে আর কোনো ফ্যাসিবাদ চাই না।’
সরকারের সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে জনগণ তা মেনে নেবে না। তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাকে জনগণ বিদায় করেছে। যদি আপনারাও ফ্যাসিবাদ কায়েম করেন, তাহলে জনগণ আপনাদেরও ছাড় দেবে না।’
সিলেটবাসীর প্রতি আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সামনে আন্দোলনের ডাক আসবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। দেশ থেকে ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি দূর না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।’
সিলেটের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের বহু ন্যায্য দাবি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখনো পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়নি। পাশাপাশি ঢাকা–সিলেট মহাসড়কের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের কথাও তুলে ধরে তিনি দ্রুত সড়কটির কাজ শেষ করার দাবি জানান। তার ভাষায়, ‘সমুদ্রের ঢেউ দেখতে বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, ঢাকা থেকে সিলেট এলেই তা বোঝা যায়।’
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘যেই জুলাই বিপ্লবের উপর ভিত্তি করে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন, সেই জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে যদি গাদ্দারি করেন, ক্ষমতার মসনদে থাকবার কোনো অধিকার আপনাদের থাকবে না। জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে গাদ্দারি করবেন না। দোহাই লাগে আপনাদের প্রথমে পায়ে ধরে বলবো, তারপরে হাতে ধরে বলবো। যদি পায়ে ধরে হাতে ধরে বললে কথা না শুনেন, ঘাট ধরতে আমাদের এতটুকু হাত কেঁপে উঠবে না।’
সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এখনো বলছি, গণভোটের গণরায় মেনে নিন। জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করুন। জনগণ যেভাবে ভোটে ম্যান্ডেট প্রদান করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের যে ম্যান্ডেট দিয়েছে, সেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করুন। অন্যথায় রাজপথে আপনাদেরকে আমরা মোকাবেলা করব, ইনশাআল্লাহ।’
ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনের গণরায়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা, পরিণামে মুক্তিযুদ্ধকে তাদের ফেস করতে হয়েছিল এবং বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল... ৭০ শতাংশ জনগণের এই ম্যান্ডেটের সঙ্গে যদি আপনারা বিশ্বাসঘাতকতার এই ধারা অব্যাহত রাখেন, আপনাদের পরিণাম পশ্চিম পাকিস্তানি সৈরগোষ্ঠী এবং শেখ হাসিনার চেয়ে ভিন্ন কিছু হওয়ার কথা নয়।’
সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ (বীর বিক্রম) বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম এবং শাইখুল হাদিস মামুনুল হক এই তিন নেতা এক হলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে। সরকার পালানোর কোনো পথ পাবে না।’
তিনি বলেন, ‘এই তিন নেতা একজোট হলে তাঁরা যেকোনো সময় ঢাকায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষের সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হবেন। টঙ্গী, সাদাবাদ ও মিরপুরের সড়ক অবরোধ করে দিতে পারবেন তারা। আপনি কোন দিকে দেশে থাকবেন? আপনাকে এটা বুঝতে হবে। আপনি অন্যদের দ্বারা প্রভাবিত হবেন না। দেশের মানুষের কথা ভেবে চিন্তা করেন।’
অলি আহমদ আরও বলেন, ‘বর্তমান সরকারের আমলে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ননি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে এবং নিত্যপণ্যের মূল্য বেড়েছে। আপনার দলের লোকেরা দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠানগুলো পাহারা দিচ্ছে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করে, আগামী পাঁচ বছরের মেয়াদ তারা সম্পূর্ণ করে যেতে পারবে না।’
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তিনি কি পাঁচ বছর নির্বাচিতভাবে ক্ষমতায় থাকতে চান, নাকি শেখ হাসিনাসহ পৃথিবীর অন্যান্য জায়গায় জনগণের রায়কে উপেক্ষা করার যে করুণ পরিণতি হচ্ছে, সেই পরিণতি তিনি ভোগ করতে চান সিদ্ধান্ত তারেক রহমানকেই নিতে হবে।’
তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের সরকার যেখানে ছাত্র-জনতার প্রতি সতর্ক ও শ্রদ্ধাশীল হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের সরকার তার উল্টো পথে হাঁটছে। তিনি বলেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ সংস্কারের পক্ষে রায় দিলেও সরকার সেই রায়কে অবজ্ঞা করছে।
দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি নিজ দলের অভ্যন্তরে কোনো সংস্কার আনেনি এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ন্যূনতম ঐকমত্য মেনে নেয়নি বলে অভিযোগ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘যদি সে জুলাই বিপ্লবকে ভুলে যায়, যদি সে ছাত্র-তরুণদের আন্দোলনকে ভুলে যায়, যদি এ দেশের হাজারো মানুষের আত্মত্যাগকে ভুলে যায়, তাহলে তার পরিণতি বিএনপি ও তারেক রহমানের সরকারকেই ভোগ করতে হবে।’
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংস্কার এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে রাজশাহী থেকে শুরু হওয়া ১১ দলীয় জোটের বিভাগীয় সমাবেশ কর্মসূচির সমাপনী আয়োজন ছিল সিলেট বিভাগীয় এ সমাবেশ।
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও সাবেক মন্ত্রী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মুমিনুল হক, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আব্দুল কাইয়ুম সুবহানী, খেলাফত আন্দোলনের আমির হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এ কে এম আমজাদুল ইসলাম চান।
জুলাই সনদ, গণভোটের রায়, শফিকুর রহমান, নাহিদ ইসলাম, মামুনুল হক, ১১ দলীয় জোট