২০ জুলাই ২০২৬

ব্যবসা-বাণিজ্য / আমদানি-রপ্তানি

আসাম-মেঘালয় থেকে আমদানি, ‘সিলেটের সাতকরা’ নামে রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক 

প্রকাশঃ ১৯ জুলাই, ২০২৬ ১০:১৭ অপরাহ্ন


লেবু জাতীয় ফল সাতকরা। আলাদা সুগন্ধ ও স্বাদের কারণে ভোজন রসিকদের কাছে এটি খুবই প্রিয়। গরু বা খাসির মাংস রান্নায় সাতকরার কোনো তুলনাই চলে না। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পর্যটক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি যারাই সিলেটে আসেন, তাদের খাবারের তালিকায় পছন্দের শীর্ষে থাকে সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস ভুনা।

সাতকরা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ফল বলা হলেও এটি মূলত সারা বছরই ভারত থেকেই আমদানি করা হয়। আবার সিলেট থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানী করা হয়। যে কারণে এটিকে সিলেটের সাতকরা বলা হয়ে থাকে।  

সিলেট অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষি বিভাগের অর্ধশতাধিক ফলের তালিকায় সাতকরার অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিভাগের চার জেলার ম্ধ্যে শুধুমাত্র সিলেট জেলায় মাত্র ১ হেক্টর জমিতে সাতকরার আবাদ হয়েছে। আর ফলন হয়েছে মাত্র ১ মেট্রিক টন।

অবশ্য একসময় সিলেট অঞ্চলে সাতকরা দেখা গেলেও এখন সেই চিত্র প্রায় বিলীন। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ‘সাতকরাকান্দি’ গ্রামও একসময় সাতকরার জন্য পরিচিত ছিল। স্থানীয়দের ভাষ্য, এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকটি গাছ ছাড়া আর তেমন উৎপাদন নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, রোগবালাই ও চাষাবাদে অনাগ্রহের কারণে সিলেটে বাণিজ্যিকভাবে সাতকরা উৎপাদন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে দেশে সাতকরার বাজার এখন ভারত থেকে আমদানিনির্ভর।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে আমদানি হওয়া সাতকরা দেশের চাহিদা মিটিয়ে ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত বছর সাতকরা ব্যবসায় লোকসানের কারণে এবার ভারত থেকে আমদানিও কম হয়েছে। সিলেট নগরীর বন্দরবাজার, আম্বরখানা ও কদমতলী এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে সাতকরার সরবরাহ খুবই কম। যে কয়েকটি দোকানে সাতকরা পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো আকারে এখনও ছোট ও পুরোপুরি পরিপক্ক নয়। মানভেদে প্রতিপিস সাতকরা ৪০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিছু দোকানে আরও বেশি দামও চাওয়া হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, সাধারণত কোরবানির ঈদের আগে ভারতীয় সীমান্তবর্তী আসাম ও মেঘালয় থেকে প্রচুর সাতকরা আসে। কিন্তু এবার আমদানি কম হওয়ায় বাজারে সংকট রয়েছে।

নগরীর কদমতলী ফল বাজারের সাতকরার পাইকারি বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, সিলেটে সাতকরার ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমদানিকারকরা বর্তমানে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। ভারত থেকে বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ বস্তা সাতকরা আমদানি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিকেজি সাতকরায় সরকারকে কর দিতে হয় ৭৬ টাকা। অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে বর্তমান বিক্রয়মূল্যে ব্যবসায়ীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। লোকসান হওয়া সত্ত্বেও কেবল সিলেটের ঐতিহ্য ধরে রাখার খাতিরে ব্যবসায়ীরা এই পণ্যটি আমদানি অব্যাহত রেখেছেন।

সাতকরা আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারি মো. নাজমুল আলম লিজন বলেন, সাতকরা সিলেটের এখন আর নেই বললেই চলে। ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয় রাজ্যের উচু পাহারে সাতকরা জন্মে। আমরা ভারত থেকেই সাতকরা আমদানি করে থাকি। পরে সিলেটের সাতকরা নামে সারাদেশে সরবরাহ করি। 

তিনি বলেন, এখন সতকরা আমদানি কমে গেছে। এসকময় সিলেটের ৪-৫জন ব্যবসায়ী সাতকরা আমদানি করতেন। লোকসান গুণতে গুণতে এখন এক-দুইজন ছাড়া সবাই এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন।  

সিলেটের খাদিমনগর এলাকার হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রকিবুল ইসলাম রুমন বলেন, সিলেটে যে সাতকরা পাওয়া যায়, তা মূলত সিলেটের নিজস্ব পণ্য নয়। এটি ভারত থেকে আমদানি করা হয়। জকিগঞ্জ সীমান্তের ওপারে ভারতের করিমগঞ্জ এলাকায় প্রচুর সাতকরার বাগান থাকলেও আমাদের সিলেটে এ ধরনের কোনো বাগান দেখা যায় না। সাতকরাকে সিলেটের নিজস্ব ব্র্যান্ড বা পণ্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত সাইট্রাস রিসার্চ ইনস্টিটিউট এটি নিয়ে গবেষণা করছে, তবে সিলেটে এর উৎপাদন অত্যন্ত সীমিত।

তিনি আরও বলেন, আমরা ব্যক্তিগতভাবে কিছু সাতকরা গাছ লাগিয়েছি। কিন্তু সেগুলোর বৃদ্ধি খুবই ধীর। দীর্ঘ সময় পার হলেও তাতে এখনো ফল ধরেনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় অতিরিক্ত পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, একসময় সাতকরা সিলেটের গর্ব ছিল। কিন্তু এখন বাণিজ্যিক উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে বাজারের চাহিদা ভারতীয় সাতকরার ওপর নির্ভরশীল। এসব সাতকরার একটি অংশ আবার ‘সিলেটি সাতকরা’ নামে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।


শেয়ার করুনঃ

ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে আরো পড়ুন

সাতকরা, সিলেট, ভারত থেকে আমদানি, কৃষি, ফলের বাজার

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ