২১ জুলাই ২০২৬

যাপিতজীবন / স্বাস্থ্য

সিলেটে প্রথমবার শিশুর শরীরে বার্ড-ফ্লু, তদন্তের পরও প্রটোকল বাস্তবায়নে ধোঁয়াশা

দেবকল্যাণ ধর বাপন

প্রকাশঃ ২০ জুলাই, ২০২৬ ৬:২৮ অপরাহ্ন

ছবিঃ এআই দ্বারা তৈরি

সিলেট নগরের বালুচর এলাকায় দেড় বছর বয়সী এক শিশুর শরীরে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লু (এইচ৫) ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার ঘটনা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নজর কেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সিলেটে এটিই প্রথম মানবদেহে শনাক্ত হওয়া বার্ড ফ্লুর ঘটনা। আক্রান্ত শিশুটি চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে উঠেছে এবং পরে আর নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।


তবে এই ঘটনাকে ঘিরে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের নেওয়া পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নির্দেশিকার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল সে প্রশ্নের সব উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তদন্ত, নজরদারি ও পরবর্তী ব্যবস্থার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক প্রটোকলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ বাস্তবায়ন হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শিশুটি চলতি বছরের ২৭ মার্চ জ্বর ও খিঁচুনি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। প্রথমদিকে চিকিৎসকেরা হাম শনাক্ত করেন। পরে সংরক্ষিত নমুনা আইসিডিডিআর,বির গবেষণাগারে পরীক্ষা করা হলে ১৯ এপ্রিল প্রকাশিত ফলাফলে এইচ৫ ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।


পরিবারের সদস্যরা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, অসুস্থ হওয়ার কয়েক দিন আগে শিশুটি বাড়িতে জবাই করে আনা ফার্মের মুরগির কাঁচা মাংস নিয়ে খেলছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, সেখান থেকেই ভাইরাসটির সংক্রমণ ঘটে থাকতে পারে।


পরে শিশুটির বাবা-মায়ের শরীরেও ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো কিছু উপসর্গ দেখা দিলেও তাদের কারও শরীরে এইচ৫ ভাইরাস শনাক্ত হয়নি। বর্তমানে পরিবারের সবাই সুস্থ আছেন।


ঘটনার পর রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর এবং আইসিডিডিআর,বি যৌথভাবে পাঁচ দিনের মাঠপর্যায়ের তদন্ত পরিচালনা করে। ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এ অনুসন্ধানে বালুচর এলাকার হাঁস এবং পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা কয়েকটি নমুনাতেও এইচ৫ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।


সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ‘নমুনা পরীক্ষায় বার্ড ফ্লু শনাক্তের পরপরই বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। শুরুতে শিশুটির বাবা-মায়ের শরীরেও কিছুটা উপসর্গ দেখা দিলেও তারা এখন সুস্থ।


তিনি আরও বলেন, ‘এই ভাইরাস একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়াতে পারে তাই সচেতনতাই সবচেয়ে জরুরি।’ এই ঘটনায় শিশুটি ফার্মের মুরগি থেকেই আক্রান্ত হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত যেকোনো পাখি থেকেই এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।’


তবে স্বাস্থ্য বিভাগের দাবি, আশপাশের সম্ভাব্য সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করা হলেও নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। সে কারণেই ঘটনাটিকে একটি 'সিঙ্গেল কেস' বা একক সংক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।


আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় কী বলা আছে?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (WOAH) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) যৌথভাবে জুনোটিক এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা মোকাবিলায় যে নির্দেশিকা দিয়েছে, সেখানে কয়েকটি বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


এর মধ্যে রয়েছে আক্রান্ত খামারের সব পাখি নিধন (কোলিং), নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধে পোল্ট্রি ও ডিম পরিবহনে কোয়ারেন্টাইন, খামারের কর্মীদের জন্য ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহার, সক্রিয় নজরদারি এবং নতুন সংক্রমণের তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে দ্রুত জানানো।


তবে স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে তদন্তের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।


এর মধ্যে রয়েছে

  • সম্ভাব্য সংক্রমণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত পাখিগুলো নিধন করা হয়েছিল কি না
  • আক্রান্ত এলাকার চারপাশে কোনো কোয়ারেন্টাইন জারি হয়েছিল কি না
  • জীবন্ত পাখি বা পোল্ট্রি পণ্য পরিবহনে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল কি না
  • আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানানো হয়েছিল কি না


এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কর্মকর্তারা শুধু বলেন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কি সেই ব্যবস্থা? তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি কারও বক্তব্যেই।


এ ব্যাপারে সিলেটের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, ‘আইসিডিডিআর,বির পরীক্ষায় ১৯ এপ্রিল শিশুটির শরীরে এইচ৫ ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়।’


তিনি বলেন, ‘আক্রান্ত শিশুর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে এবং নতুন কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।’


তিনি বলেন, ‘এটি একটি একক ঘটনা। তদন্ত দলের সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’


তবে সেই ব্যবস্থা কী নেয়া হয়েছিল বিষয়ে তিনি বিস্তারিত বলেননি।


এদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মিজানুর রহমান মিয়া বলেন, ‘কোনো এলাকায় অস্বাভাবিকভাবে মুরগি মারা গেলে তাদের কর্মকর্তারা তদন্ত করেন এবং প্রয়োজনে নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়।’ 


তবে তিনি স্বীকার করেন, জনবল সংকটের কারণে সব খামারে নিয়মিত নজরদারি সম্ভব হয় না।


টিকাদান নিয়েও তিনি সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, সরকারি টিকাদান কর্মসূচি মূলত হ্যাচারি, গ্র্যান্ড প্যারেন্ট ও প্যারেন্ট স্টক খামারে সীমাবদ্ধ। ছোট ও পারিবারিক খামারের অনেকগুলোই এই ব্যবস্থার বাইরে থেকে যায়।


এছাড়া অসচেতনতার কারণে অনেক সময় অসুস্থ বা মৃত মুরগি বাজারে বিক্রি করা হয় কিংবা যথাযথভাবে ধ্বংস করা হয় না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?
চিকিৎসক সোহেল আহমদের মতে, মানুষের শরীরে বার্ড ফ্লু শনাক্ত হওয়া বিরল হলেও প্রতিটি ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। কারণ এ ধরনের সংক্রমণ কখনও কখনও প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ভাইরাসের অভিযোজনের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।এ কারণে শুধু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাই নয়, সম্ভাব্য সংক্রমণ উৎস নিয়ন্ত্রণ, আক্রান্ত এলাকার নজরদারি, পোল্ট্রি ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত প্রটোকলের প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ।


বার্ড ফ্লু কী?
বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা ইনফ্লুয়েঞ্জা-এ ভাইরাসজনিত একটি সংক্রামক রোগ, যা প্রধানত পাখির মধ্যে ছড়ায়। এর মধ্যে এইচ৫এন১ (H5N1) মানুষের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরনগুলোর একটি। সংক্রমিত পাখির লালা, মল, নাকের নিঃসরণ বা দূষিত পরিবেশের সংস্পর্শে এলে মানুষ আক্রান্ত হতে পারে।


কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, অসুস্থ বা মৃত পাখির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা, কাঁচা মুরগির মাংস স্পর্শের পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং মাংস ও ডিম ভালোভাবে রান্না করে খাওয়াই সংক্রমণ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে খামারে বায়োসিকিউরিটি নিশ্চিত করা এবং সন্দেহজনক সংক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা ও নজরদারি বাড়ানোও জরুরি।


শেয়ার করুনঃ

যাপিতজীবন থেকে আরো পড়ুন

বার্ড ফ্লু, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, H5N1, H5 ভাইরাস, সিলেট বার্ড ফ্লু, বালুচর, শিশুর শরীরে বার্ড ফ্লু, আন্তর্জাতিক প্রটোকল, WHO, WOAH, FAO, IEDCR, ICDDR,B

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ