২৩ এপ্রিল ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / দুর্যোগ

‘অরক্ষিত’ বাঁধ ভেঙে ডুবছে শহর-গ্রাম, দায় কার

আহমেদ জামিল

প্রকাশঃ ২ জুন, ২০২৫ ১০:২৭ অপরাহ্ন


চলতি বছরের শুরুতে সিলেটের জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ ও বেশ কয়েকটি প্রকল্পের কাজ আটকে যায় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষা বাহিনী বিএসএফের বাঁধায়। ভারত থেকে বাঁধা আসায় কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো। পানি উন্নয়ন বোর্ডও তখন নিরব দর্শক হয়ে যায়।

এ অবস্থায় বন্যা ও বাঁধ ভাঙার শঙ্কা থেকে বার বার সংস্কার কাজ শেষ করার দাবি জানিয়ে আসছিল জকিগঞ্জ ও কানাইঘাটের মানুষ। কিন্তু তাদের সেই দাবি উপক্ষিত হয়। অবশেষে সীমান্তবাসীর সেই শঙ্কাই বাস্তবে রূপ নিলো।

রোববার রাত থেকে জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রারাই ও ভাখরশাল গ্রাম, পৌরসভার ছয়লেন এলাকা, খলাছড়া ইউনিয়নের লোহারমহল, বীরশ্রী ইউনিয়নের সুপ্রাকান্দি, লাফাকোনা ও লক্ষীবাজার এলাকায় অন্তত ৭-৮ স্থানে বাঁধ ভেঙে হুঁ হুঁ করে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। এতে ১২ ঘন্টার মধ্যেই উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

তাছাড়াও আরও অসংখ্য এলাকায় বাঁধ উপচে পানি প্রবেশ করে। এতে করে খোঁদ জকিগঞ্জ উপজেলা বাজারও হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন।

এই পরিস্থিতির জন্য স্থানীয়রা পানি উন্নয়ন বোর্ডকেই দায়ী করছেন। কিন্তু পাউবো বলছে, এই বিষয়টি তাদের না। বিএসএফ কাজে বাঁধা দেওয়ায় যৌথ নদী কমিশনকে জানানো হয়েছে। তারা বিষয়টি সমাধান করার কথা। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বিষয়টি সমাধান করার এখতিয়ার তাদের নেই।

আর যৌথ নদী কমিশন বলছে, এই বিষয়টি নিয়ে ভারতের সাথে কথা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরকেও জানিয়েছে। কিন্তু ভারত জরিপের জন্য সময় চেয়েছে।


২০২২ ও ২০২৩ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভাঙনের পর গতবছর জকিগঞ্জ উপজেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীর অন্তত ২০-২৫টি স্থানে ইমারর্জেন্সী প্রকল্পের কাজ শুরু করে পাউবো। তাছাড়াও ২০২৪ সালে সুরমা নদীর ৮০ কিলোমিটার এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজ শুরুর সময় কিছু বস্তা ও মাটি ফেলে রাখা হয়। পরে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ ছিল। আবার যখন শুরু করা হয় তখন বিএসএফের বাধায় আবার কাজ বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় চার-পাঁচমাস কাজ বন্ধ ছিল। পরে বৃষ্টিপাত শুরুর আগে তড়িঘড়ি করে কিছু মাটি ফেলা হয়।

গত কয়েক দিন থেকে টানা বর্ষণ ও উজানের ঢল নামায় পানির প্রবল চাপে এসব বাঁধের মধ্যে ফাঁটল দেখা দেয়। জকিগঞ্জের ছবরিয়া, শরীফগঞ্জ, থানাবাজারা, রারাইসহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি স্থানে ফাঁটল দেখা দিলে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশের শঙ্কা ছিল। সোমবার সেই শঙ্কা বাস্তবে রূপ নেয়।

এদিকে, সুরমা নদীর ৮০ কিলোমিটার প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজও হচ্ছে ধীর গতিতে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের ২৬ জুন। কিন্তু ধীর গতিতে কাজ হওয়ায় এখন পর্যন্ত তিনটি প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে ৩২ থেকে ৪৮ শতাংশ। বাকি দুটির কাজ কাগজে-কলমে ৯০ শতাংশ শেষ হলেও বাস্তবে অনেক কাজ বাকি রয়েছে। কাজ শেষ না হওয়ায় এসব বাঁধও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে করে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

রোববার রাত থেকে জকিগঞ্জ সদর ইউনিয়নের রারাই ও ভাখরশাল গ্রাম, পৌরসভার ছয়লেন এলাকা, খলাছড়া ইউনিয়নের লোহারমহল, বীরশ্রী ইউনিয়নের সুপ্রাকান্দি, লাফাকোনা ও লক্ষীবাজারসহ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এছাড়া পৌর শহরের কেছরী গ্রামে কুশিয়ারা নদীর পানি বাঁধের ওপর দিয়ে উপচে পড়ছে। এতে জকিগঞ্জ পৌর শহরের বেশিরভাগ এলাকাই পানিতে তলিয়ে গেছে। ছবড়িয়া, সেনাপতির চক, ইছাপুর, পিল্লাকান্দি, আমলসীদ, গদাধর ও বড়ছালিয়াসহ অর্ধশতাধিক এলাকায় বাঁধ উপচে পানি ঢুকছে লোকালয়ে।

নদীর পানি বাড়তে থাকায় নদী তীরবর্তী এলাকার বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছেন।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পানি বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, সময়মতো বাঁধ সংস্কার না করায় এমন দুর্দশার সৃষ্টি হয়েছে। রোববার থেকে নদীর পানি বাড়লেও পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বারবার বালুর বস্তার চাহিদা জানিয়েও মেলেনি প্রতিকার। এতে এলাকাবাসীর মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ বিরাজ করছে।

সোমবার রাতে জকিগঞ্জের ছবরিয়া এলাকার বাসিন্দা ফয়েজ আহমদ বলেন, গত বছরের বন্যায় বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ অবস্থা ছিল ছবরিয়া এলাকায়। পানি উন্নয়ন বোর্ড পরে বস্তা ফেলে রেখেছিল। তিন চার মাস আগে ঠিকাদার এস্কেভেটর নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু বিএসএফ এসে বাধা দেয়। কয়েকদিন আগে কিছু মাটি ফেলে চলে যান।

তিনি বলেন, এখন নদীর পানি বাড়ায় ও প্রবল স্রোতের তোড়ে ওই বাঁধে ফাঁটল ধরেছে। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে পারে। বিষয়টি পাউবোসহ সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাঁধটি রক্ষা করার জন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

আমলশীদ এলাকার বাসিন্দা মর্তুজা আহমদ বলেন, ডাইকের সমান উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। গতবছর ডাইকের বিভিন্ন ভাঙা অংশে মাটি ও বস্তা দিয়ে রাখা হয়। কিন্তু পুরনো ডাইকের মতো শক্ত করা হয়নি। এখন পানির চাপে নড়েবড়ে অবস্থা। যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করতে পারে। আবার পানি বাড়লে ডাইক উপচেও পানি প্রবেশ করতে পারে।

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান শাহজালাল এন্টারপ্রাইজের সত্বাধিকারী মোস্তাক আহমদ চৌধুরী বলেন, নদী প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ চলা অবস্থায় বিএসএফ এসে বাঁধা দেয়। স্থানীয়রা প্রথম দিকে প্রতিবাদ করেন। কিন্তু পরে বিএসএফ গুলি করার হুমকি দেয়। পরে আর কাজ করা হয়নি। বিষয়টি পাউবোকে আমরা  জানালে তারা বলেন চুপিসারে যতটুক করা যায় করতে হবে। এভাবেই কাজ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কিছু কিছু এলাকায় ইমার্জেন্সী প্রকল্পের কাজ একাধিকবার করা হয়েছে। তবুও বাঁধ শক্তিশালী হয়নি। ছবরিয়া এলাকায় নদীর ভেতরের অংশে বড় ধরণের খোঁদ রয়েছে। পাউবো থেকে ভেতরের অংশে কাজ না করে দিলে এই বাঁধ স্থায়ীভাবে মেরামত হবে না।

এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ বলেন, জকিগঞ্জ-কানাইঘাটে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের সবকটি জায়াগায় বিএসএফ বাধা দেয়। যেখানে নদীর কেন্দ্র থেকে ১৫০ মিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ কাজ চলছিল, সেসব জায়াগায় বিএসএফের বাঁধায় কাজ বন্ধ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বিএসএফ বলছে জকিগঞ্জ-কানাইঘাট সীমান্ত এলাকার নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি। আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে নদীর সীমানা নির্ধারণ করা না হলে বা পিলার বসানো না থাকলে তারা কাজ করতে দেবে না।

তিনি আরও বলেন, পাউবোর পক্ষ থেকে এই বিষয়টি বিজিবি ও যৌথ নদী কমিশনের কাছে জানানো হয়েছে। এই দুটি সংস্থা ভারতের সঙ্গে অসংখ্যবার দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ও পতাকা বৈঠক করেছে। তবুও সমাধান হয়নি।

দীপক রঞ্জন আরও বলেন, সম্প্রতি ভারত তাদের সীমান্তে নদী প্রতিরক্ষার কাজ করার জন্য আমাদের চিঠি দিয়েছে। কিন্তু আমরা বলেছি, তোমরা কাজ করলে আমরাও আমাদের কাজ করবো। এখন এই অবস্থাতেই রয়েছে।

যৌথ নদী কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ আবুল হোসেন সিলেট ভয়েসকে বলেন, আমার বিষয়টি ভারতকে জানিয়েছি, যৌথ নদী কমিশনের সভায়ও আলোচনা হয়েছে। উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করেছি। প্রতিমাসে মন্ত্রণালয়ে একটা করে রিপোর্ট দেওয়া হয়। গতকালও দেওয়া হয়েছে। আমাদের দিক থেকে সব করেছি। কিন্তু ভারত সময় নিয়েছে, তারা বলছে জরিপ করতে সময় লাগবে।

তিনি আরও বলেন, আসলেই এসব কাজে সময় লাগে। সাথে সাথে অনুমতি পাওয়া যায় না। কিন্তু এ বছর আমরা খুব কম সময় পেয়েছি। কম সময়ের মধ্যে অনুমতি পাওয়া যায়নি। 


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

জকিগঞ্জ বন্যা, কানাইঘাট বাঁধ ভাঙন, সুরমা কুশিয়ারা নদী বন্যা, বিএসএফ বাঁধা নদী

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ