১২ জুলাই ২০২৬

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ / দুর্যোগ

মৌলভীবাজারে পানিবন্দি ৩৮ হাজার মানুষ, হবিগঞ্জে কমতে শুরু করেছে বন্যার পানি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ১১ জুলাই, ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ন


টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার চারটি উপজেলার ২৮টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৩৮ হাজার ১১২ জন মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। একই সময়ে হবিগঞ্জে বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদ-নদীর পানি নামতে শুরু করেছে। ফলে সেখানে বন্যা পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন।

 

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৯৯৮টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজনগর উপজেলায় একজনের মৃত্যুর তথ্যও নিশ্চিত করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

 

জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা, কমলগঞ্জ উপজেলার ৬টি, রাজনগর উপজেলার ৫টি এবং কুলাউড়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে।

 

এদিকে বন্যাকবলিত মানুষের জন্য সদর ও রাজনগর উপজেলায় মোট ১৯টি আশ্রয়কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বর্তমানে ১ হাজার ৯৮৮ জন আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন, ইউনিয়ন পরিষদ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে কাজ চলছে।

 

এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৭৫০ প্যাকেট শুকনা খাবার, ১০ মেট্রিক টন চাল এবং ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কুলাউড়ায় ৯ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অন্যান্য উপজেলায় কয়েকশ প্যাকেট শুকনা ও রান্না করা খাবার এবং জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে আরও ৩০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

 

জনসাধারণের জানমাল রক্ষায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসন বলছে, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বন্যাসংক্রান্ত যেকোনো তথ্য বা অভিযোগ জানাতে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের (০১৭১৩-৯১৬৭২৯) নম্বরে যোগাযোগের আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, মৌলভীবাজারের প্রধান নদ-নদীগুলোর পানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। শনিবার (১১ জুলাই) রাত ৯টা পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার অধিকাংশ নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টের পানি এখনো বিপৎসীমার খুব কাছাকাছি রয়েছে।

 

পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, মনু নদীর চাঁদনীঘাট পয়েন্টে রাত ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ১১ দশমিক ২৩ মিটার, যা বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার নিচে। দিনের শুরুতে এ পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকলেও সন্ধ্যার পর তা নিচে নেমে আসে। এতে ওই এলাকার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতির আভাস মিলছে।

 

মনু নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৫ দশমিক ০০ মিটার, যা বিপৎসীমার ২ মিটার ৫৫ সেন্টিমিটার নিচে। ধলাই নদীর রেলওয়ে ব্রিজ পয়েন্টে পানির উচ্চতা ছিল ১৬ দশমিক ৫০ মিটার, যা বিপৎসীমার ২ মিটার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

 

কুশিয়ারা নদীর শেরপুর পয়েন্টে রাত ৯টায় পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয়েছে ৮ দশমিক ৫০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে। অন্যদিকে জুড়ি নদীর পানির উচ্চতা ছিল ১০ দশমিক ০৯ মিটার, যা বিপৎসীমার ২৬ সেন্টিমিটার নিচে।

 

পাউবো বলছে, অধিকাংশ নদ-নদীর পানি কমলেও কুশিয়ারা নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার কাছাকাছি থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

 

মৌলভীবাজারের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) তৌহিদুজ্জামান পাভেল বলেন, বন্যা পরিস্থিতির দিকে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন উপজেলায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।  

 

হবিগঞ্জে কমতে শুরু করেছে নদ-নদীর পানি

এদিকে, সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে হবিগঞ্জে। বৃষ্টিপাত কমে আসায় নদ-নদীর পানিও ধীরে ধীরে নামছে। তবে বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো প্লাবিত থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ পুরোপুরি কাটেনি।

 

জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কালীগঞ্জ এলাকায় ভাঙনের কারণে অন্তত ৩০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। বর্তমানে জেলার তিনটি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৬ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। বিশেষ করে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বন্যার প্রভাবে দুর্ভোগে পড়েছেন। বন্যাদুর্গতদের জন্য খোলা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।

 

বন্যার পানিতে হবিগঞ্জ-মিরপুর সড়কের বিভিন্ন অংশ তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সদরের মাছুলিয়া এবং চুনারুঘাটের বাল্লা পয়েন্টে নদীটির পানি বিপৎসীমার ১০ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে।

 

জেলা প্রশাসন বলছে, নদ-নদীর পানি কমতে শুরু করায় পরিস্থিতির ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। পানি আরও নেমে গেলে মানুষের দুর্ভোগও কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।


শেয়ার করুনঃ

প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ থেকে আরো পড়ুন

মৌলভীবাজার বন্যা, হবিগঞ্জ বন্যা, পানিবন্দি মানুষ, মনু নদী, কুশিয়ারা নদী

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ