জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণেই থাকছে শাহজালাল মাজারের ডেগ ও দানবাক্স
রাজনীতি
প্রকাশঃ ২২ জুন, ২০২৬ ২:৫৬ অপরাহ্ন
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের আয়-ব্যয় ও দান ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও ধর্মীয় স্পর্শকাতরতা ও সামাজিক বাস্তবতার কারণে কোনো সরকারই সরাসরি প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের পথে যায়নি। তবে সেই দীর্ঘদিনের প্রচলিত ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। আর সেই উদ্যোগের কিছুদিনের মধ্যেই তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে তার বদলি ঘিরে নতুন বিতর্ক ও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে ন্যস্ত করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বদলির কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের পরপরই এই সিদ্ধান্ত আসায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মাজারের দান ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনের উদ্যোগ
গত ১২ জুন হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম। পরিদর্শনের পর তার নির্দেশে মাজারের দানের তিনটি বড় ডেগ সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে নতুন দানবাক্স স্থাপন, নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্য মোতায়েন এবং পরে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল দান-খয়রাত ও মানতের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে মাজারে আগত ভক্তদের দেওয়া অর্থ ও অন্যান্য দানের হিসাব নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও এ ধরনের পদক্ষেপ আগে দেখা যায়নি।
প্রশাসনের এই উদ্যোগ সাধারণ মানুষের একটি অংশের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ হিসেবে বিষয়টিকে স্বাগত জানান। তবে মাজার-সংশ্লিষ্ট পরিবার, কিছু ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং নাগরিক সমাজের একটি অংশ এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে।
‘স্বচ্ছতা দরকার ছিল, কিন্তু পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন’
সিলেটের বিশিষ্টজনেরা বলছেন, মাজারের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। তবে বিষয়টি স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত হওয়ায় আরও বিস্তৃত আলোচনা ও অংশীজনদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন ছিল।
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের আহ্বায়ক আব্দুল করিম কিম বলেন, মাজারের দান-খয়রাত ও মানতের অর্থে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মাজার-সংশ্লিষ্ট পরিবার ও সিলেটের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া প্রশাসনিকভাবে সরাসরি হস্তক্ষেপ করায় অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
তার ভাষ্য, হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, সিলেটের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ। তাই এ ধরনের উদ্যোগে স্থানীয় অংশগ্রহণ থাকলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া কম হতে পারত।
সমর্থনও কম নয়
অন্যদিকে সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের পর তার সমর্থনে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন অনেকেই। রোববার বিকেলে নগরের কোর্ট পয়েন্টে ‘সিলেটের সর্বস্তরের জনগণ’-এর ব্যানারে মানববন্ধন করেন কয়েকজন আলেম ও নাগরিক প্রতিনিধি।
মানববন্ধনে বক্তারা দাবি করেন, মাজারে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও কথিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের জন্যই তিনি সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অনেকেই একই ধরনের মতামত দিয়েছেন। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি বিষয়ে প্রশাসন প্রথমবারের মতো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিয়েছিল।
উদ্বেগ প্রকাশ ৬৬ বিশিষ্ট নাগরিকের
এদিকে মাজারে দানবাক্স স্থাপন ও পুরোনো ডেগ সিলগালার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশ ও প্রবাসের ৬৬ জন বিশিষ্ট নাগরিক। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছেন, শত শত বছরের ঐতিহ্যবাহী দরগাহে এ ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ স্বাধীন বাংলাদেশে আগে দেখা যায়নি।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী, নেফ্রোলজিস্ট অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদ, প্রবীণ আইনজীবী তবারক হোসেন, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক, সনাক সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরীন আক্তার, লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব শামিম আজাদসহ বিভিন্ন পেশাজীবী ও প্রবাসী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
তারা মনে করেন, বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
আলোচিত এক প্রশাসকের যাত্রা
সারওয়ার আলম সিলেটে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের সময়ও আলোচনায় ছিলেন। র্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা বিভিন্ন অভিযানের কারণে জাতীয়ভাবে পরিচিতি পান। ২০২৫ সালে কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথরে পাথর উত্তোলন ও লুটপাটের ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হলে তাকে সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
তার দায়িত্বকাল খুব দীর্ঘ না হলেও মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপের উদ্যোগ তাকে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে আধ্যাত্মিক রাজধানীর দুই মাজার
হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারকে ঘিরেই সিলেট ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে আগত লাখো মানুষ প্রতিবছর এই দুই মাজার জিয়ারত করেন। ভক্তদের দেওয়া দান, মানত ও অন্যান্য উপঢৌকন বহু বছর ধরে মাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক উৎস।
কিন্তু সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্নের মুখে প্রশাসনের সরাসরি হস্তক্ষেপ যেমন প্রশংসা কুড়িয়েছে, তেমনি সৃষ্টি করেছে বিতর্কও। তবে তার নেওয়া পদক্ষেপ, মাজারকেন্দ্রিক বিতর্ক এবং বদলির সময়কাল—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখনো সিলেটের জনপরিসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
এদিকে সারওয়ার আলমের প্রত্যাহারের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে সরকার বলছে, এটি প্রশাসনের নিয়মিত বদলির অংশ মাত্র। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী স্পষ্ট জানিয়েছেন, মাজার ইস্যুর সঙ্গে এই বদলির কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে প্রত্যাহারের পর সন্ধ্যায় গণমাধ্যমের কাছে মুখ খোলেন সদ্য বিদায়ী জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। বিদায়বেলায় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, 'বদলি কারণে-অকারণে হতে পারে। সরকার যখন যেখানে যাকে দিয়ে কাজ করাতে চায় সেখানেই যেতে হবে। একটি ভালো কাজ শুরু করেছিলাম, শেষ করা গেলো না। অনেকের পেটে হাত পড়ায় তারা এর বিরুদ্ধাচরণ করেছে।'
সারওয়ার আলম, সিলেট ডিসি, ডিসি সারওয়ার আলম বদলি, শাহজালাল মাজার, শাহপরাণ মাজার, মাজারের দানবাক্স