২৩ জুন ২০২৬

অনিয়ম-দুর্নীতি

প্রত্যাহারের পরও পিছু হটেননি ডিসি সারওয়ার, করলেন নজির স্থাপন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশঃ ২৩ জুন, ২০২৬ ১২:০৫ পূর্বাহ্ন


নজিরবিহীন ঘটনার জন্ম দিয়ে সিলেট ছাড়ছেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া জেলার ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাসে কেউ যা করতে পারেনি, বিদায়ের আগ মুহুর্তে তিনি তা করে গেছেন। তার সাহসী পদক্ষেপেই হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে মাত্র চারদিনে সাড়ে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা জমা পড়ার খবর পেয়েছে সিলেট তথা পুরো দেশ।

 

অথচ শত-শত বছর ধরে শাহাজালাল মাজারের দানবাক্সে জমা পড়া টাকার কোনো হিসাব জানার সুযোগ হয়নি সিলেটবাসীর। এই হিসাবে স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিতেই প্রত্যাহার হন আলোচিত ডিসি মো. সারওয়ার আলম। তবে শেষ দিনে এসে মাজারের দানের টাকা প্রকাশ্যে এনে গণনা করে নজির স্থাপন করেছেন তিনি। 

 

গত বছর সাদাপাথর লুট কাণ্ডে আলোচিত সময়ে ডিসি হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সিলেটে এসেছিলেন সারওয়ার আলম। সম্প্রতি শাহজালালের মাজার ইস্যুতে আলোচনার তুঙ্গে এসে সিলেট ছাড়ছেন তিনি।

 

জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, সোমবার রাতে সিলেট ত্যাগ করার কথা সদ্য প্রত্যাহার হওয়া ডিসি মো. সারওয়ার আলমের। 

 

সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাঈদা পারভীন বলেন, ‘সোমবার রাতেই ডিসি মহোদয় সিলেট ছেড়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ভারপ্রাপ্ত ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।‘

 

তিনি বলেন, ’মাজারের টাকা সোনালী ব্যাংকে মাজারের নামীয় একটি হিসাবে রাখা হবে। সম্প্রতি এই অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। পরবর্তীতে এই টাকার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।‘ 

 

এর আগে সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজারের সিলগালা করা দানের তিনটি বড় ডেগ ও একটি দানবাক্স খোলা হয়। একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুটি টাকা গণনার মেশিনের সাহায্যে দীর্ঘ চার ঘণ্টা গণনা শেষ করেন।

 

গণনা শেষে সিলেট ও সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াক্ফ অফিসার সজল মিয়া বলেন, গত বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে আজ সোমবার দুপুর পর্যন্ত চার দিনে মাজারের দানবাক্সে জমা পড়েছে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা। পাশাপাশি পাওয়া গেছে ৭ আনা স্বর্ণ, সৌদি রিয়াল, মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ডসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা।

 

বিতর্ক থেকে নজির স্থাপন 


হযরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার শুধু সিলেটের একটি ধর্মীয় স্থান নয়। দেশের আধ্যাতিক রাজধানী হিসেবেও এটি পরিচিত। প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ও ভক্তের আগমনে এখানে বিপুল পরিমাণ দান জমা হয়। কিন্তু সেই অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন ছিল। কিন্তু কোনো প্রশাসনই সেখানে হস্তক্ষেপ করেনি।

 

সম্প্রতি মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নেন সিলেটের ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে নতুন দানবাক্স স্থাপন, পুরোনো দানের ডেগ সিলগালা ও মাজারের নামে নতুন ব্যাংক হিসাব খোলা হয়।

 

তার এই উদ্যোগের পরপরই ধর্মীয় অঙ্গন, সামাজিক মহল এবং বিভিন্ন পরিসরে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ এটিকে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও অনেকে এটিকে  মাজারের প্রচলিত ব্যবস্থায় প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।

 

এমন আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মো. সারওয়ার আলমকে সিলেটের জেলা প্রশাসকের পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।

 

প্রত্যাহারের আদেশ, তবু পিছু হটেননি

 

এদিকে, ডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহারের আদেশ প্রকাশের পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, মাজারের দানবাক্স গণনার উদ্যোগ হয়তো আর বাস্তবায়িত হবে না। কিন্তু প্রত্যাহারের আদেশের পরও তিনি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।

 

সোমবার দুপুরে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে মাজার এলাকায় উপস্থিত হন তিনি। প্রশাসনের তত্বাবধানে মাজারে তিনটি বড় ডেগ ও একটি দানবাক্স খুলে প্রকাশ্যে টাকা গণনা করা হয়।

 

গণনার পুরো সময় তিনি সামনে নাা আসলেও নিরাপদ দূরত্বে থেকে কার্যক্রম তদারকি করেন। পরে গণনা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগেই তিনি এলাকা ত্যাগ করেন। তবে এ সময় তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।

 

প্রকাশ্যে এলো দানের হিসাব

 

গণনা শেষে সিলেট ও সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াকফ কর্মকর্তা সজল মিয়া জানান, তিনটি ডেগ ও একটি দানবাক্স থেকে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৪৯ টাকা পাওয়া গেছে। এছাড়া স্বর্ণালঙ্কার, স্বর্ণখণ্ড এবং বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া গেছে।

 

তিনি বলেন, দানের পুরো অর্থ সোনালী ব্যাংকে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের নামে সম্প্রতি খোলা হিসাবে জমা রাখা হবে। ভবিষ্যতে এই অর্থের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহার সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।

 

এ অবস্থায় অনেকেই মাজারে বছরের পর বছর দানের টাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। টাকা গণনার সময় মাজারে অবস্থান করা সামির মিয়া নামে এক দর্শনার্থী বলেন, চারদিনে ১৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জমা পড়েছে। সেই হিসেবে একদিনে গড়ে সাড়ে চার লাখ টাকা জমা হয়েছে। শত শত বছর ধরে এতো কোটি কোটি টাকা তাহলে কারা ভোগ করলো প্রশ্ন তোলেন তিনি।

 

তিনি আরও বলেন, ডিসি সারওয়ার যে সাহসী পদক্ষেপ নিয়ে সিলেটবাসীর কাছে মাজারের যে হিসাব তুলে ধরেছেন, সেজন্য সিলেটবাসী তার কাছে কৃতজ্ঞ।

 

আহসান উল্লাহ নামে এক দর্শনার্থী বলেন, ডিসি সারওয়ারের উদ্যোগ সিলেটের ইতিহাসে মাইলফলক। তবে তিনি সিলেটের মন্ত্রী-এমপি ও বিশিষ্টজনকে নিয়ে এই কাজ করলে হয়তো প্রত্যাহার হতেন না। তবে তিনি যেটা করেছেন তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

জনমনে আলোচনার ঝড়

 

শাহজালালেল মাজারের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দানবাক্স খোলা ও টাকা গণনার ঘটনাকে ঘিরে সোমবার দিনভর মাজার এলাকায় উৎসুক মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই এটিকে ইতিহাসের অংশ হওয়ার মুহূর্ত হিসেবে দেখেছেন।

 

অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সিলেটজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পক্ষে-বিপক্ষে মতামতের বন্যা বয়ে যায়। বিভিন্ন নাগরিক ও সামাজিক সংগঠন বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে।


শেয়ার করুনঃ

অনিয়ম-দুর্নীতি থেকে আরো পড়ুন

সিলেটের ডিসি, সারওয়ার আলম, শাহজালাল মাজার, দানের বাক্স, প্রত্যাহার

আরো পড়ুনঃ

আরো পড়ুনঃ